অচেনা নামের আড়ালে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
স্বামীর ফোনে অন্য এক নারীর নাম দেখে সেদিন মিতার মনে হয়েছিল, হয়তো সব শেষ।
অথচ আসলে কিছুই শেষ হয়নি। শুধু একটা নাম তাদের দুজনের মাঝখানে এমন একটা নীরবতা এনে দিয়েছিল, যেটা ভাঙতে দুজনেরই কয়েকটা দিন লেগে গেল।
আরিফ আর মিতার বিয়ের আট বছর হয়ে গেছে।
সংসারে খুব বড় কোনো সমস্যা ছিল না। মাসের শেষে একটু টানাটানি হতো। ছেলের স্কুল, বাজার, বাসার খরচ, এসব নিয়ে ব্যস্ততা ছিল।
কখনো অভিমান। কখনো রাগ। তারপর আবার ঠিক হয়ে যাওয়া। এইভাবেই চলছিল।
সেদিন রাতে আরিফ গোসল করতে যাওয়ার আগে ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে গিয়েছিল।
মিতা সাধারণত আরিফের ফোন ধরত না। বিশ্বাসের অভাব ছিল না।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এলো। স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠল।
"নীরা।"
মিতা নামটা আগে কখনো শোনেনি। তারপর মেসেজটা চোখে পড়ল।
"কালকের বিষয়টা ভুলে যেও না।"
ব্যস, এতটুকুই। কিন্তু অনেক সময় এতটুকুই যথেষ্ট হয়। মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভয়গুলো তখন নিজের মতো করে গল্প বানাতে শুরু করে।
আরিফ ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিল। মিতা তখন চুপ। আগের মতো কথা বলছে না।
আরিফ কয়েকবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে?"
মিতা মাথা নাড়ল। "কিছু না।"
কিন্তু সে জানত, কিছু একটা হয়েছে। আরিফও বুঝেছিল। শুধু কেউ কথাটা শুরু করছিল না।
আগে রাতে খাওয়ার পর দুজন অনেকক্ষণ গল্প করত। এখন দুজন পাশাপাশি বসেও যেন দূরে থাকত।
আরিফ ভাবত, মিতা হয়তো কোনো কারণে কষ্ট পেয়েছে। মিতা ভাবত, আরিফ হয়তো কিছু লুকাচ্ছে।
দুজনেই নিজের নিজের ধারণার মধ্যে আটকে ছিল।
শেষ পর্যন্ত এক রাতে মিতা আর থাকতে পারল না। খাবার টেবিলে বসে হঠাৎ বলল, "নীরা কে?"
আরিফ থমকে গেল। "কোন নীরা?"
মিতা ফোনটা এগিয়ে দিল। আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল, "তুমি এটা নিয়ে এতদিন চুপ ছিলে?"
মিতা কিছু বলল না। তার রাগের চেয়ে কষ্টটাই বেশি ছিল।
আরিফ ধীরে বলল, "নীরা আমার অফিসের একজনের স্ত্রী।"
মিতা তাকিয়ে রইল।
"তাহলে আমাকে বলোনি কেন?"
আরিফ একটু চুপ করে বলল, "জানি না। মনে হয়নি আলাদা করে বলার মতো কিছু।"
তারপর ফোনটা খুলে দেখাল। কয়েক মাস আগে তার এক সহকর্মী, সজল, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। নীরা আর তার ছোট ছেলেটা অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ে গেছে।
অফিসের পেনশনের কাগজপত্র আর ছেলের স্কুলের ভর্তির ব্যাপারে আরিফ সাহায্য করছিল।
মিতা চুপ করে বসে রইল। তার মনে পড়ল, কয়েকদিন আগে আরিফ বলেছিল, "অফিসের একজনের একটু সমস্যা হয়েছে। একটু সাহায্য করছি।"
সে সেদিন খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। নিজের ভয়টাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
আরিফ আস্তে করে বলল, "তুমি একবার জিজ্ঞেস করলেই তো হতো।"
মিতা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল, "ভয় পেয়েছিলাম।"
"কিসের ভয়?"
কিছুক্ষণ পর মিতা বলল, "তোমাকে হারানোর।"
আরিফ কিছু বলল না। শুধু মিতার দিকে তাকিয়ে রইল।
এরপর থেকে দুজন একটা বিষয় ঠিক করল। কিছু মনে হলে চুপ করে থাকবে না। জিজ্ঞেস করবে। কথা বলবে।
কয়েকদিন পর রাতে আবার দুজন বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল।
আগের মতো সবকিছু হয়ে যায়নি। হয়তো পুরোপুরি হবেও না। কারণ সম্পর্কের ভেতরের ভয় একদিনে চলে যায় না।
কিন্তু তারা আবার কথা বলা শুরু করেছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।