আংটির দাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
২ নভেম্বর ২০২৬
বাবার আংটিটা বিক্রি করতে গিয়ে রাশেদ দুবার দাম জিজ্ঞেস করেছিল।
প্রথম দোকানদার বলেছিল, ‘পাথরটা খুলে দিলে সোনার দাম পাবেন।’
দ্বিতীয় দোকানদার আংটিটা হাতে নিয়ে ওজন করল। তারপর বলল, ‘এত পুরোনো ডিজাইন। গলিয়ে ফেলাই ভালো।’
রাশেদ মাথা নাড়ল।
বাবার মৃত্যুর পর আংটিটা আলমারির ড্রয়ারে পড়ে ছিল। সোনার জিনিসপত্রের হিসাব করতে গিয়ে শারমিন বলেছিল, ‘এটা রেখে কী হবে? বিক্রি করে মেয়ের ভর্তি খরচটা দাও।’
কথাটা যুক্তিসংগত ছিল। মেয়ের নতুন স্কুলে ভর্তি হতে বেশ কিছু টাকা লাগবে। রাশেদ তখন দোকানের অগ্রিম আর বাসার কিস্তি নিয়ে চিন্তায় ছিল। আংটিটা বিক্রি করলে কিছুটা চাপ কমবে।
তবু আংটিটা নিয়ে বের হওয়ার সময় তার মনে হচ্ছিল, বাবার কাছ থেকে শেষবারের মতো কিছু একটা কেড়ে নিচ্ছে।
দোকানদার টাকা গুনে দিল। রাশেদ পকেটে রাখল। বের হওয়ার আগে একবার কাচের কাউন্টারের দিকে তাকাল। আংটিটা আর সেখানে নেই। দোকানদার অন্য একজনের গয়না ওজন করছিল।
বাবা জীবনে টাকার হিসাব খুব ভালো রাখতেন। মাসের বাজার, বিদ্যুৎ বিল, ছেলের স্কুলের বেতন, সবকিছুর খরচ খাতায় লিখতেন। রাশেদ ছোটবেলায় বাবার খাতা খুলে দেখত। কোন মাসে কত টাকা জমেছে, কোথায় খরচ হয়েছে, তার পাশে বাবার ছোট ছোট মন্তব্য।
বাবা তাকে ভালো স্কুলে পড়িয়েছিলেন। কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় নতুন জামা কিনে দিয়েছিলেন। চাকরি পাওয়ার পর বলেছিলেন, ‘এবার নিজের পায়ে দাঁড়া।’
কিন্তু নিজের অসুখের সময় তিনি টাকার হিসাব ছাড়তে পারেননি।
ডাক্তার যখন ঢাকায় বড় হাসপাতালে দেখাতে বলেছিলেন, বাবা বলেছিলেন, ‘এখানেই তো চিকিৎসা হচ্ছে।’
রাশেদ তখন ব্যবসার জন্য একটি মেশিন কেনার টাকা জমাচ্ছিল। বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘মেশিনটা কিনে ফেল। ব্যবসায় কাজে লাগবে।’
রাশেদ মেশিন কিনেছিল। বাবার চিকিৎসা পরে করানো হবে বলে ভেবেছিল।
পরে আর হয়নি।
বাবার মৃত্যুর পর সেই মেশিনটা ব্যবসায় কাজে দিয়েছিল। এখনো দেয়। রাশেদ মাঝেমধ্যে মেশিনটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবার কথাটা মনে পড়ে। তখন মনে হয়, মেশিনটা না কিনলেও হয়তো চলত। আবার মনে হয়, বাবা নিজেই তো কিনতে বলেছিলেন।
এই হিসাবের কোনো শেষ নেই।
আংটি বিক্রি করে বাসায় ফেরার পথে রাশেদ একটি ফোন পেল। অফিসের কর্মচারী সেলিম। গত সপ্তাহে তাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছিল রাশেদ। হিসাবের একটি ভুল নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। সেলিম বলেছিল, ‘স্যার, একটু সময় দেন। আমার ছেলেটার হাসপাতালে পরীক্ষা আছে।’
রাশেদ বলেছিল, ‘অফিসে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে আসবেন না।’
সেলিম আর কথা বলেনি।
ফোনে সে বলল, ‘স্যার, কালকে কি একবার দেখা করতে পারি?’
রাশেদ বলল, ‘কী জন্য?’
‘একটু কথা ছিল।’
‘অফিসে আসবেন।’
ফোন রেখে রাশেদ পকেট থেকে টাকা বের করে গুনল। আংটির দামটা ঠিকই পেয়েছে। কিন্তু সেলিমের ফোনের পর টাকাগুলো যেন অন্য রকম লাগছিল।
বাসায় এসে সে টাকা শারমিনের হাতে দিল। শারমিন ভর্তি খরচের হিসাব লিখে রাখল। তারপর বলল, ‘আংটিটা বিক্রি করে খারাপ লাগছে?’
রাশেদ বলল, ‘না।’
শারমিন কিছু বলল না। টাকা গুছিয়ে ড্রয়ারে রাখল।
রাতে বাবার পুরোনো খাতাটা বের করেছিল রাশেদ। পাতায় পাতায় খরচের হিসাব। কোথাও স্কুলের বেতন, কোথাও বাজার, কোথাও মেশিন কেনার টাকা। শেষের দিকে কয়েকটি পাতা ফাঁকা।
একটি পাতায় বাবার হাতের লেখায় লেখা, ‘রাশেদের দোকানের জন্য।’
তার নিচে কোনো হিসাব নেই।
রাশেদ পাতাটার ওপর হাত রেখে বসে রইল। দোকান করার কথা সে বাবাকে বলেছিল একবার। বাবা বলেছিলেন, ‘চাকরিটা আগে পাকাপোক্ত হোক। তারপর দেখা যাবে।’
তারপর সংসারের খরচ, ভাইয়ের পড়াশোনা, নিজের বিয়ে, মেয়ের জন্ম। দোকানের কথা আর ওঠেনি।
বাবা কি সত্যিই টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন? নাকি শুধু লিখে রেখেছিলেন? রাশেদ জানে না।
পরদিন সেলিম অফিসে এসেছিল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আমার ছেলেটার পরীক্ষা হয়েছে। ডাক্তার বলেছে আরও কিছুদিন দেখতে হবে।’
রাশেদ কম্পিউটারের পর্দা থেকে চোখ সরাল না।
‘হিসাবের ভুলটা কেন হয়েছিল?’
সেলিম ব্যাখ্যা করল। রাশেদ শুনল। ভুল ছিল, কিন্তু ইচ্ছা করে টাকা সরানোর প্রমাণ নেই।
‘আপনি আবার কাজে আসতে পারবেন,’ রাশেদ বলল। ‘তবে হিসাবটা ঠিক করে দিতে হবে।’
সেলিম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ‘ধন্যবাদ, স্যার।’
রাশেদ মাথা নাড়ল। সেলিম চলে যাওয়ার পর সে চেয়ারে হেলান দিল। মনে হলো, কথাটা আরও সহজে বলা যেত। এতদিন কেন বলা হয়নি?
সন্ধ্যায় মেয়ে স্কুলের খাতা নিয়ে তার কাছে এল।
‘বাবা, কাল আমাদের স্কুলে অনুষ্ঠান। তুমি যাবে?’
রাশেদ খাতা থেকে চোখ তুলল।
‘কখন?’
‘সকাল দশটায়।’
সে ক্যালেন্ডার দেখল। অফিসে একটি জরুরি কাজ আছে। চাইলে অন্য কাউকে দিয়ে করানো যায়, কিন্তু সে অভ্যাস করেনি।
মেয়ে আবার বলল, ‘বাবা, কাল যাবে?’
রাশেদ ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খাতাটা বন্ধ করল।
‘যাব।’
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।