লালচে নীরবতার দিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প
। ১৮ মে, ২০২৬
সকালের টেবিলে বসে মুন খুব ধীরে পানি খাচ্ছিল। এমনভাবে, যেন গ্লাসটা নামালেই তাকে কিছু একটা বলতে হবে। রান্নাঘর থেকে ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ আসছিল। বাবা প্রতিদিনের মতো খবরের কাগজ খুলে বসেছেন।
তিনি একবার তাকিয়ে বললেন,
— কী রে, কলেজে যাবি না?
মুন মাথা তুলল না। চোখের নিচে কালি জমেছে। ঠোঁট শুকনো। শরীরটা কুঁকড়ে আছে।
রাফি ডিম ভাজি খেতে খেতে হেসে বলল,
— আবার মুড সুইং?
গ্লাসটা ধরতে গিয়ে মুনের হাত কেঁপে উঠল। একটা শব্দ, মাত্র দুটো শব্দ। অথচ মনে হলো শরীরের ভেতর কিছু জোরে মোচড় দিল।
মুন খুব আস্তে বলল,
— আজকে প্লিজ ঝামেলা করিস না।
রাফি ভুরু কুঁচকাল।
— আরে, কিছু বললেই তো রাগ করিস।
মুন আর বসে থাকল না। চেয়ারটা শব্দ করে পিছিয়ে গেল। তারপর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল।
তার মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— মেয়েদের এই সময় একটু এমন হয়। সহ্য করতে হয়।
ঘরের ভেতর শব্দটা ঝুলে রইল— “সহ্য”।
মুন বিছানায় বসে পড়ল। নিচের পেটটা মোচড় দিচ্ছে। ব্যথাটা ঢেউয়ের মতো উঠছে নামছে। মাথাও ভার লাগছে।
ড্রয়ার খুলে সে থমকে গেল। একটা মাত্র প্যাড আছে।
তার বুকের ভেতর আতঙ্ক জমল। এই ভয়টা নতুন না। মুনের ক্লাস সেভেনের কথা মনে পড়ল।
সাদা ইউনিফর্মে ছোট্ট লালচে দাগ দেখে সে ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল। বাসায় ফিরে কাঁপা গলায় মাকে বলতেই মা দ্রুত তাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর নিচু স্বরে বলেছিলেন,
— কাউকে বলবি না এসব।
কেন বলবে না— সেই প্রশ্নটা কখনও উত্তর পায়নি।
দুপুরে ব্যথা বাড়ল। কলেজে যাওয়া হলো না। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালে পানি পড়ার শব্দ ঘরটাকে ভারী করে তুলছে।
এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।
— ঢুকব?
রাফি।
সে ঢুকে পড়ল। হাতে ফার্মেসির প্যাকেট।
— এই নে।
মুন তাকাল।
— কী এটা?
রাফি একটু অস্বস্তি নিয়ে মাথা চুলকাল।
— ফার্মেসিতে গিয়ে প্রথমে কিছু বলতে পারছিলাম না। পরে আঙ্কেলকে চুপি চুপি বললাম। ওষুধও নিয়ে আসছি।
মুন চুপ করে নিল।
রাফি বলল,
— ইউটিউবে দেখছিলাম… এই সময় নাকি অনেক ব্যথা হয়।
মুনের চোখ ভিজে উঠল।
রাফি বিছানার পাশে বসে রইল।
— আগে বুঝতাম না। মনে হতো তুই ইচ্ছা করে রাগ করিস।
— অনেকেই ভাবে,
মুন ধীরে বলল।
— কারণ কেউ বলে না।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রাফি বলল,
— তুই যদি এত ব্যথা নিয়েও ঠিক থাকার চেষ্টা করিস, তোকে নিয়ে মজা করা ভুল।
মুন জানালার দিকে তাকাল। বৃষ্টির পানি কাঁচ বেয়ে নামছে। মনে হলো, শরীরের ব্যথার পাশাপাশি একটা চুপ থাকাও সে বহন করে এসেছে।
সন্ধ্যায় মা এসে পাশে বসলেন।
— আমরা ছোটবেলায় এসব নিয়ে কথা বলতে পারতাম না। তাই হয়তো তোমাদের সাথেও সহজ হতে পারিনি।
মুন শুনল।
মা বললেন,
— কিন্তু চুপ থাকলে কিছু বদলায় না।
রাতে বাবা বললেন,
— শরীর খারাপ থাকলে কাল যাস না।
থেমে যোগ করলেন,
— আর লাগলে বলবি। লজ্জার কিছু নাই।
রাতে মুন ফোন হাতে নিল। লিখল—
“মাসিক অসুখ না। এটা শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই সময় শরীর বদলায়, মনও বদলায়। তাকে ‘ড্রামাটিক’ বলা সহজ। পাশে দাঁড়ানো কঠিন। কিন্তু আমরা বদলাই সেখান থেকেই— যখন বিচার কম করি, বোঝার চেষ্টা বেশি করি।”
ফোনটা বন্ধ করে দিল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি।
কিন্তু আজ বৃষ্টিটা চাপা না— পরিষ্কার। মনে হলো বহুদিনের জমে থাকা কিছু ধুয়ে যাচ্ছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।