ভালো মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আমার স্বামী ভালো মানুষ, তাই আমি তাকে ঘৃণা করি।
কথাটা কাউকে বলতে পারি না। বললে সবাই অবাক হয়ে তাকাবে। আমার বান্ধবীরা বলে, “তোর কপাল ভালো। এমন স্বামী সবাই পায় না।” মা বলেন, “লোকটা তোকে কত ভালোবাসে! কখনো চেঁচামেচি করে না, নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় না। আর কী চাই?”
আমি কোনো উত্তর দিই না।
রাশেদ কখনো আমার সঙ্গে ঝগড়া করে না। আমি রেগে গেলে চুপ করে থাকে। আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে বলে, “তুমি যেটা ভালো মনে করো।” কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে রাজি হয়, যেতে না চাইলে বাড়িতে থাকে। আমার পছন্দের খাবার আনে, অসুস্থ হলে ওষুধ কিনে দেয়। কোনো কিছু নিয়ে অভিযোগ করলে মৃদু হেসে বলে, “আচ্ছা, ঠিক আছে।”
এই ‘ঠিক আছে’ কথাটাই আমার সবচেয়ে অসহ্য লাগে।
আমাদের বিয়ের সাত বছর হয়েছে। এই সাত বছরে রাশেদ একবারও দরজা আছড়ে বেরিয়ে যায়নি। আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে রাখেনি। রাগের মাথায় কোনো খারাপ কথা বলেনি। এমনকি আমি অন্যায় করলেও সে আমাকে অপমান করে না।
প্রথম দিকে এসব ভালো লাগত। ভাবতাম, এমন শান্ত মানুষ পেয়েছি, আমার আর কীসের অভাব?
গত শুক্রবারের কথাই ধরা যাক।
আমার ছোট ভাই ফোন করে জানাল, সে আমাদের বাসায় কয়েক দিন থাকবে। আমি তখন রান্নাঘরে। রাশেদ পাশের ঘরে বসে কাজ করছিল। ফোন রাখার পর তাকে বললাম, “শুনেছ? ও আসছে।”
রাশেদ বলল, “ভালো তো। আসুক।”
“তুমি একবারও ভাবলে না, আমাদের নিজেদেরও তো একটা জীবন আছে?”
সে ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে তাকাল। “তুমি কি চাও না ও আসুক?”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “আমি কী চাই, সেটা কি সব সময় আমাকেই বলতে হবে?”
রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ঠিক আছে। তুমি যা ভালো মনে করো।”
আমি রান্নাঘরে ফিরে এলাম। গ্যাসের চুলায় ডাল ফুটছিল। চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে আমার কান্না পেয়ে গেল।
একদিন রাতে কথাটা বলেই ফেলেছিলাম।
“তুমি কখনো আমার সঙ্গে তর্ক করো না কেন?”
রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল। “তর্ক করে কী হবে?”
“সব সময় কি কিছু হওয়ার জন্য তর্ক করতে হয়? তোমার কি কোনো পছন্দ নেই? কোনো অপছন্দ নেই? কোনো কিছুতে আমার সঙ্গে দ্বিমত হয় না?”
সে একটু হেসে বলল, “হয় তো। কিন্তু সব কথা নিয়ে ঝামেলা করার কী দরকার?”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আবার ফোনে চোখ নামিয়ে নিল।
সেদিন বুঝলাম, আমাদের মধ্যে নীরবতা শুধু শান্তি নয়। কিছু কথা না বলার অভ্যাসও।
রাশেদ খারাপ মানুষ নয়। সে আমাকে ঠকায় না, অপমান করে না, আমার স্বাধীনতায় বাধা দেয় না। সে সত্যিই আমাকে ভালোবাসে—নিজের মতো করে।
একদিন বিকেলে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম। রাশেদ আমার কাপের পাশে বিস্কুটের প্লেটটা এগিয়ে দিল।
বলল, “আরেক কাপ চা করে দেব?”
আমি বললাম, “না।”
সে কাপটা হাতে নিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।