দুটো কাগজের মাঝখানে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ। অভিক টেবিলের সামনে বসে আছে। সামনে দুটো কাগজ।
একটা বাবার প্রেসক্রিপশন। আরেকটা আরিয়ানের স্কুলের বকেয়া বেতনের নোটিশ।
প্রেসক্রিপশনে কয়েকটা পরীক্ষা, নিয়মিত ওষুধের নাম। স্কুলের কাগজে লেখা, বেতন পরিশোধ না করলে আগামী সাময়িক পরীক্ষায় বসা যাবে না।
অভিক আবার হিসাব করল। মাসিক বেতন পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত, ছেলের পড়াশোনা, সব বাদ দিলে হাতে যা থাকে, তা দিয়ে বাবার পরীক্ষা আর স্কুলের বেতন একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব না, অন্তত এই মাসে।
সে খাতাটা টেনে নিল। একবার বাবার পরীক্ষার টাকাটা লিখল। তারপর স্কুলের বেতন। তারপর আবার কেটে দিল। কোনো হিসাব মিলছে না।
টেবিলের কোণে বাবার ওষুধের পাতাটা খালি পড়ে আছে।
অভিক সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
"এখনও ঘুমাওনি?"
নিশির গলা শুনে সে মাথা তুলল।
নিশি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক গ্লাস পানি।
"ঘুম আসছে না।"
নিশি টেবিলের ওপর রাখা কাগজ দুটো দেখল। কিছু বলল না।
একটু পর ধীরে বলল, "কাল বাবার ওষুধ আনতে হবে।"
অভিক মাথা নাড়ল। "জানি।"
"আর আরিয়ানের স্কুলের টাকা?"
অভিক চুপ করে রইল।
নিশি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, "আমার আলমারিতে যে ছোট চেইনটা আছে..."
"না।"
নিশি থেমে গেল।
"একবার শুনবে?"
"না নিশি।"
অভিকের গলা নিচু ছিল। রাগ ছিল না। ছিল একরকম অসহায়ত্ব।
নিশি আর কিছু বলল না। পানির গ্লাসটা টেবিলে রেখে চলে গেল।
অভিকের বাবা হাবিব সাহেব খুব বেশি কথা বলতেন না। সারা জীবন নিজের মতো করে সংসার সামলেছেন।
অভিকের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় টাকার টান পড়েছিল। তখন হাবিব সাহেব তার পুরোনো ফিলিপস রেডিওটা বিক্রি করে দিয়েছিলেন। রেডিওটা ছিল তার খুব প্রিয়। ভোরে নামাজের পর বসে খবর শুনতেন।
অভিক একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "বাবা, রেডিওটা কেন বিক্রি করলে?"
হাবিব সাহেব শুধু বলেছিলেন, "তোর পড়াটা আগে হোক।"
আজ অভিক বুঝতে পারে, ওই ছোট কথাটার পেছনে কত বড় ত্যাগ ছিল।
হাবিব সাহেবের শরীর কয়েক মাস ধরে ভালো যাচ্ছে না। কিডনির সমস্যা ধরা পড়েছে। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করতে বলেছেন। তিনি বারবার বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছেন।
সেদিন সকালে অভিক বাবার ঘরে ঢুকল। হাবিব সাহেব জানালার পাশে বসে ছিলেন।
"বাবা, ওষুধ খেয়েছ?"
"হ্যাঁ।"
অভিক টেবিলের দিকে তাকাল। ওষুধের পাতা আগের জায়গাতেই আছে।
বাবা বুঝে গেলেন। "সব ওষুধ কি খুব দরকার?"
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "ডাক্তার তো বলেছেন।"
হাবিব সাহেব জানালার বাইরে তাকালেন। "পরীক্ষাগুলো একটু পরে করলে হয় না?"
অভিক বাবার দিকে তাকাল। কথাটার মানে বুঝতে সময় লাগল না।
"টাকা কম পড়ছে?"
হাবিব সাহেব আর কিছু বললেন না। নীরবতাই উত্তর হয়ে গেল।
একটু পর তিনি শুধু বললেন, "আরিয়ানের স্কুলের ব্যাপারটা আগে দেখিস।"
অভিক নিচু গলায় বলল, "আপনার চিকিৎসা বাদ দিয়ে?"
হাবিব সাহেব মৃদু হাসলেন। "আমি তো আছি।"
এই কথাটাই অভিকের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল। মানুষ অনেক সময় নিজের কষ্টকে ছোট করে দেখে, হয়তো ছেলেকে বাঁচাতে।
সেদিন অফিসে অভিকের কাজে মন বসল না। কম্পিউটারের সামনে বসে থেকেও বারবার ভুল করছিল।
বস একবার জিজ্ঞেস করলেন, "শরীর খারাপ?"
অভিক মাথা নেড়ে বলল, "না স্যার।"
বিকেলে বেতন পেল। টাকা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর ঠিক করল। বাবার ওষুধ কিনবে। স্কুলে গিয়ে সময় চাইবে। হয়তো কিছুদিন পিছিয়ে যাবে পরীক্ষা। হয়তো কিছু কথা শুনতে হবে। তবু আরিয়ানকে স্কুলে সমস্যায় পড়তে দেওয়া যাবে না।
রাতে খাওয়ার সময় আরিয়ান বলল, "বাবা, স্যার কাল টাকা দিতে বলেছেন।"
অভিক ছেলের দিকে তাকাল। "আমি স্কুলে কথা বলব।"
আরিয়ান একটু চুপ করে থেকে বলল, "আমার জন্য তোমার সমস্যা হচ্ছে?"
অভিক থমকে গেল। "কে বলেছে?"
"কেউ না।"
ছেলেটা খাওয়া শেষ করে উঠে গেল। অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
পরদিন সকালে অভিক স্কুলে গেল। প্রধান শিক্ষকের সামনে বসে কথাগুলো বলতে অস্বস্তি হচ্ছিল।
"স্যার, একটু সময় দিলে..."
কথাটা শেষ করতে গলা শুকিয়ে গেল। তবু সে বলল।
স্কুল থেকে দুই সপ্তাহ সময় পাওয়া গেল।
ফিরে এসে সে বাবার ওষুধ কিনল। কিছু পরীক্ষা পরে করার সিদ্ধান্ত হলো। সমস্যা শেষ হলো না।
কিন্তু সেদিন রাতে অন্তত দুটো কাগজের একটাকে ছিঁড়ে ফেলতে হয়নি।
কয়েকদিন পর গভীর রাতে অভিক বাবার ঘরে গেল। হাবিব সাহেব ঘুমাচ্ছিলেন। টেবিলের ড্রয়ার খুলতে গিয়ে একটা ভাঁজ করা কাগজ পেল।
আরিয়ানের হাতের লেখা। ছোট ছোট অক্ষরে লেখা, "দাদু, তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাও।"
কাগজটার পাশে রাখা ছিল বাবার ওষুধের খালি পাতা।
অভিক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কাগজটা হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে পড়ল।
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। জানালার গ্রিল বেয়ে পানি এখনও টুপটাপ করে পড়ছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।