পুরুষ মানুষ কাঁদে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৯ আগস্ট ২০২৬
ছোটবেলায় অভিক একবার উঠোনে পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটেছিল।
হাঁটু থেকে রক্ত বেরোতে দেখে সে কাঁদছিল। বাবা দূর থেকে দেখে বলেছিলেন,
এই, কাঁদছিস কেন? পুরুষ মানুষ কাঁদে না।
অভিক চোখ মুছে উঠে দাঁড়িয়েছিল।
মা কাছে এসে হাঁটুর মাটি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। কিছু বলেননি। শুধু ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন।
সেদিনের কথাটা অভিকের মনে থেকে গিয়েছিল।
তারপর থেকে ব্যথা পেলেও সে কাঁদত না। সাইকেল থেকে পড়ে হাত কেটে গেলে চুপ করে থাকত। পরীক্ষায় খারাপ করলেও মুখ গোমড়া করে বসে থাকত, কিন্তু চোখের পানি ফেলত না।
কেউ জানতে চাইলে বলত,
চিন্তা করে কী হবে?
কথাটা বলতে বলতে একসময় সেটাই তার মুখের অভ্যাস হয়ে গেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সংসারের টানাটানি বুঝতে শিখেছিল অভিক। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করত। নিজের খরচ চালাত, বাড়িতেও টাকা দিত।
বিয়ের পর দায়িত্ব আরও বাড়ল।
নিশি, তারপর মেঘলা, মিশি।
মেয়েদের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া, বাজার, সংসারের নানা খরচ—সবকিছুর হিসাব মাথায় রাখতে রাখতে নিজের কথাগুলো কোথায় যেন পিছনে পড়ে গেল।
অফিসের সহকর্মীরা মাঝেমধ্যে বলত,
তোমাকে দেখে মনে হয় কোনো চিন্তাই নেই।
অভিক হেসে বলত,
চিন্তা করে কী হবে?
তারপর নিজের কাজ করত।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে অবশ্য হিসাবের খাতা খুলে বসত। মেয়েদের আগামী মাসের ফি, বাড়িভাড়া, বাজারের খরচ—একটার পর একটা সংখ্যা।
কখনো হিসাব মিলত না।
তখন খাতাটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকত।
পরদিন সকালে আবার সব স্বাভাবিক।
একদিন সেই চাকরিটাই চলে গেল।
অফিসে ডেকে বলা হলো, কয়েকজনকে ছাঁটাই করা হচ্ছে। অভিকের নামও সেই তালিকায়।
বের হওয়ার সময় হাতে একটা খাম ধরিয়ে দেওয়া হলো।
দরজার সামনে এসে সে একবার পেছনে তাকাল।
কত বছর ধরে এই দরজা দিয়ে ঢুকেছে।
আজ বেরিয়ে আসার সময় জায়গাটাকে অচেনা মনে হলো।
রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসে পড়ল।
চা এল।
চা ঠান্ডা হয়ে গেল।
খামটা সে খুলল না।
ফোন বের করে নিশির নামের ওপর আঙুল রাখল।
কল করল না।
মেঘলার কথা মনে পড়ল। মিশির কথা মনে পড়ল।
তারপর ফোনটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়াল।
বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল।
দরজা খুলে নিশি বলল,
এত দেরি?
অভিক জুতো খুলতে খুলতে বলল,
অফিসে একটু কাজ ছিল।
নিশি তার মুখের দিকে তাকাল।
কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না।
শুধু জিজ্ঞেস করল,
খাবে?
হুম।
খেতে বসে মেঘলা বলল,
বাবা, কাল আমার প্রেজেন্টেশনটা একবার দেখে দিও।
দেব।
মিশি বলল,
আমার অ্যাসাইনমেন্টটাও।
অভিক হেসে বলল,
দুটোই দেখব।
নিশি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর অভিক বারান্দায় গিয়ে বসেছিল।
নিশি কিছুক্ষণ পর এসে পাশে দাঁড়াল।
ঘুমাওনি?
ঘুম আসছে না।
নিশি বসে পড়ল।
আজ তোমাকে কেমন যেন লাগছে।
অভিক নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছু বলল না।
নিশিও জোর করল না।
অনেকক্ষণ পর অভিক আস্তে বলল,
নিশি।
হুম?
আমার চাকরিটা নেই।
নিশি চুপ করে রইল।
অভিক বলল,
আজ সারাদিন কাউকে বলতে পারিনি।
আমাকেও না?
অভিক মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।
জানি না কেন।
নিশি তার হাতটা ধরে বলল,
চাকরি গেছে। তুমি তো আছ।
অভিক এবার মুখ তুলল।
কিছু একটা বলতে চেয়েও পারল না।
চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
নিশি হাতটা ছাড়ল না।
পরদিন সকালে মেঘলা বারান্দায় এসে দেখল, বাবা একা বসে আছে।
সামনের ছোট টেবিলের ওপর সেই খামটা পড়ে আছে।
এখনও খোলা হয়নি।
মেঘলা কিছু জিজ্ঞেস করল না।
শুধু বাবার পাশে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ পর মিশিও এসে চুপচাপ তাদের পাশে বসল।
ভেতর থেকে নিশি বলল,
চা দেব?
অভিক এবার মুখ তুলে বলল,
দাও।
নিশি চারটা কাপ নিয়ে বারান্দায় এসে রাখল।
সকালের আলো ধীরে ধীরে উঠছিল।
খামটা তখনও টেবিলের ওপর।
খোলা হয়নি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।