রঙহীন ক্যানভাসের ভেতরের আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২২, ২০২৬
ঢাকার ভেতরের কোনো এক গলিতে, বয়সে নুইয়ে পড়া একটা ভবনের চতুর্থ তলায় তাদের বাসা। খুব বড় কিছু না—বরং ঠিক যতটুকু হলে মানুষ টিকে থাকতে পারে, ততটুকুই। ছাদের পলেস্তারা জায়গায় জায়গায় খসে আছে; দেয়ালের রং এতবার মলিন হয়েছে যে আসল রংটা কী ছিল, সেটা এখন আর মনে করার উপায় নেই। বিকেলের আলো জানালার ফাঁক গলে ভেতরে ঢোকে ঠিকই, কিন্তু আলোটা কেমন যেন ফিকে—মনে হয়, এ ঘরে ঢুকে সে-ও একটু ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
অভিক বিছানায় আধশোয়া। চোখ ছাদের দিকে, কিন্তু সে আসলে কী দেখছে, সেটা স্পষ্ট না। হয়তো কিছুই না, আবার হয়তো এমন কিছু—যা ভাষায় ধরা যায় না। পাশে বসে নিশি। তার হাতে ওষুধের পাতাটা ধরা; কয়েকটা ট্যাবলেট নেই, বাকিগুলো অক্ষত। এই অর্ধেক-খাওয়া অবস্থাটাই যেন তাদের বর্তমান অবস্থার একটা চুপচাপ ইঙ্গিত।
হঠাৎ অভিক বলল, “তুমি কি খেয়াল করেছো, কষ্টগুলো শব্দ করে না—তবু কাজ করে যায়? যেন নিজের মতো করে ছবি আঁকে।”
নিশি তাকাল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলল না। এমন কথার জবাব তাড়াহুড়ো করে দেওয়া যায় না।
অভিক একটু থামল, তারপর আবার বলল, “চোখের জলে মিশে যায় রং। তারপর ধীরে ধীরে একটা ছবি দাঁড়িয়ে যায়—আমার জীবন, বা হয়তো তার একটা ভাঙা সংস্করণ। তুমি ভাবতে পারো, আমি বাড়িয়ে বলছি। কিন্তু কখনও কখনও মনে হয়, সুখের যে ছবিগুলো আমরা কল্পনা করি, সেগুলোর রঙও আসলে দারিদ্র্যের ভেতর থেকেই উঠে আসে—একধরনের নীল, যা চোখে লাগে না, কিন্তু থেকে যায়।”
নিশি মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার চোখ ভিজে উঠেছে—এটা লুকানোর চেষ্টা খুব একটা সফল হলো না, তবু সে চেষ্টা করল।
ঘরের কোণায় ছোট একটা টেবিল। সেখানে এলোমেলো কাগজপত্র—গল্পের খসড়া, অর্ধেক লেখা কবিতা, কিছু ছেঁড়া পৃষ্ঠা। এগুলোই অভিকের কাজ, তার পরিচয়ও হয়তো। অনলাইনে এই লেখাগুলো পড়ে অনেকেই মন্তব্য করে; কেউ বলে, “আপনার লেখায় নিজের কথা খুঁজে পাই।” কথাগুলো মিথ্যে মনে হয় না। তবু এক ধরনের অস্বস্তি থেকে যায়—যে মানুষ অন্যদের জীবনের ভাষা খুঁজে দেয়, তার নিজের জীবনের ভাষা এত জটিল কেন?
“শোনো,” অভিক আবার বলল, এবার গলায় একটু ভাঙা সুর, “আমার মেয়েটা… ও কি সত্যিই আর কলেজে যেতে পারবে না? এই বছরের পরীক্ষাটা—ও কি দিতে পারবে?”
প্রশ্নগুলো সরাসরি, কিন্তু উত্তরগুলো কোথাও নেই।
নিশি এবার থামতে পারল না। “সব ঠিক হয়ে যেতে পারে,” সে বলল ধীরে, যেন শব্দ বেছে নিচ্ছে, “তুমি দেখো… চাকরিটা এবার হতে পারে। সময় লাগছে, কিন্তু—”
অভিক হেসে ফেলল। খুব জোরে না। বরং এমন এক হাসি, যা শুনলে বোঝা যায়—এটা আসলে হাসি না।
“এই কথাগুলো বলো না,” সে শান্ত গলায় বলল, “অপারেশনের পর থেকে নিয়ম করে ওষুধই খেতে পারছি না। ভাড়া তিন মাস বাকি। মেয়ের ফিও জমে আছে। তুমি বলো, এসবের মধ্যে আশা ঠিক কোথায় বসে আছে?”
নিশি এবার চুপ করে গেল। সে যে উত্তর জানে না, সেটা তার চোখেই বোঝা যায়।
তারপরও সে হার মানে না পুরোপুরি। “তোমার তো অনেক পরিচিত মানুষ আছে,” সে বলল, একটু থেমে, “যারা তোমার লেখা পড়ে, এত কথা বলে… তাদের মধ্যে কেউ কি আসতে পারে না?”
অভিক চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল—নীরবতা জমাট বাঁধল।
“হতে পারে,” সে ধীরে বলল, “তারা লেখাগুলোকে চেনে। মানুষটাকে না।”
বাইরে তখন মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি আসছে। সন্ধ্যা নেমে গেছে, কিন্তু পুরো অন্ধকার এখনো হয়নি—একটা মাঝামাঝি সময়, যেখানে সবকিছু একটু অনিশ্চিত লাগে।
এই সময়েই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
নিশি একটু চমকে উঠল। এই সময় সাধারণত কেউ আসে না।
দরজা খুলতেই দেখা গেল এক তরুণ। বয়স তিরিশের আশেপাশে হবে। হাতে একটা ব্যাগ, চোখে কিছুটা দ্বিধা—কিন্তু তবু এসেছে।
“এটা কি অভিক ভাইয়ের বাসা?” সে জিজ্ঞেস করল।
নিশি মাথা নেড়ে তাকে ভেতরে ঢুকতে বলল।
ছেলেটা ঘরে ঢুকে চারপাশে তাকাল, তারপর অভিকের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ। মনে হলো, সে আগে ঠিক করছে—কীভাবে বলবে।
“আমি আপনার লেখা পড়ি,” সে বলল শেষে, “অনেকদিন ধরে। আপনি একবার লিখেছিলেন… ঠিক শব্দগুলো হয়তো হুবহু মনে নেই, কিন্তু অর্থটা এমন—কষ্টের মধ্যেও যে মানুষ স্বপ্ন দেখে, সে আসলে টিকে থাকে। কথাটা মাথায় থেকে গেছে।”
অভিক তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে কৌতূহল আছে, আবার একটু অবিশ্বাসও।
ছেলেটা ব্যাগটা টেবিলের ওপর রাখল। “এখানে কিছু টাকা আছে,” সে বলল, “খুব বেশি না। তবে আপাতত কাজে লাগতে পারে—এমনটাই ভেবেছি।”
নিশি বিস্মিত। সে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল।
“আপনি কেন করছেন এটা?” প্রশ্নটা বেরিয়ে এল শেষ পর্যন্ত।
ছেলেটা একটু হেসে বলল, “আপনি হয়তো আমাদের চেনেন না। কিন্তু আমরা আপনাকে কিছুটা চিনি—আপনার লেখার মাধ্যমে। মনে হলো, শুধু পড়েই থাকাটা ঠিক হচ্ছে না।”
কথাগুলো বড় কোনো ভাষণ না। তবু ওজন আছে।
অভিক কিছু বলতে পারল না। চোখে জল চলে এল—ধীরে, কিন্তু স্পষ্ট।
“লিখে যান,” ছেলেটা বলল, “এটাই আপনার কাজ। বাকিটা… দেখা যাবে।”
সে চলে গেলে ঘরে আবার নীরবতা ফিরে এল। তবে এই নীরবতা আগের মতো ভারী লাগছে না। ভেতরে কোথাও একটা সামান্য ফাঁক তৈরি হয়েছে—যেখানে আলো ঢুকতে পারে।
অভিক বলল, “দেখলে? সবাই একই রকম না—মনে হয়।”
নিশি তাকিয়ে রইল, তারপর খুব হালকা করে হাসল। “আমি তো বলেছিলাম, এমন হতে পারে,” সে বলল।
জানালার বাইরে তখন অন্ধকার। দূরে একটা ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে—স্থির, খুব উজ্জ্বল না, কিন্তু নিভেও যাচ্ছে না।
অভিক সেই আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “কষ্টগুলো এখনও ছবি আঁকে… সেটা বদলায়নি। তবে আজ মনে হচ্ছে, ছবিটা পুরোপুরি একরঙা না।”
নিশি তার হাত ধরল। শক্ত করে না, আলগা করে—যেন ধরে রাখাটাই যথেষ্ট।
সময় থেমে আছে—এমন মনে হতে পারে। কিন্তু হয়তো পুরোপুরি থামে না কখনও। খুব ধীরে, প্রায় অদৃশ্য গতিতে, জীবন আবার এগোতে শুরু করে।
হয়তো সেই ক্যানভাসে এখনও নীল রং বেশি। তবু কোথাও কোথাও অন্য রঙ ঢুকছে—খুব সূক্ষ্মভাবে। সেটা আশা কি না, নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে ইঙ্গিতটা অস্বীকার করা যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।