একটি দিনের ভেতর থেমে থাকা বাক্য
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ১০,২০২৬
“মা কথাটি ছোট্ট অতি—” অভিক লিখে থামে। লাইনটা শেষ করে না। শেষটা তার জানা। আর যেটা আগে থেকেই জানা, সেটা আবার লিখে দিলে কি সত্যিই কিছু নতুন হয়—এই প্রশ্নটা মাথায় এসে বসে।
সে কলমটা একটু সরিয়ে রাখে। ডেস্কে কাগজ ছড়ানো, এক পাশে ঠান্ডা চা। লিখতে বসেছে—মা দিবস নিয়ে। কিন্তু শুরুতেই আটকে গেছে।
অদ্ভুত ব্যাপার, মা নিয়ে লেখা কঠিন না; বরং এতটাই সহজ যে সেটাই সমস্যার মতো লাগে। সে একটা লাইন লেখে—“মায়ের বিশালত্ব কোনো কিছু দিয়েই…” আর এগোয় না। কেটে দেয়।
এই ধরনের বাক্য শুনলে মনে হয় কেউ যেন আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে কী বলা উচিত। এতে ভুল নেই, কিন্তু নিজের কিছু থাকে না।
অভিক চুপ করে বসে থাকে। ভাবতে চেষ্টা করে সে আসলে কী লিখতে চায়।
মা দিবস। এই শব্দটার সঙ্গে একটা তৈরি রুট আছে—ইতিহাস, কিছু আবেগ, কয়েকটা উদ্ধৃতি, শেষে ব্যক্তিগত স্মৃতি। সে রুটটা মাথায় আসতেই বিরক্ত লাগে। কারণ সে বুঝতে পারে—ওই পথে গেলে সে লিখবে, কিন্তু নিজের মতো করে না।
তবুও একটা জায়গায় গিয়ে থামে।
মা হারিয়ে কেউ কি একটা দিন বানায়?
প্রশ্নটা মাথায় আসে, থেকে যায়। বাকিটা ঝাপসা। মনে রাখতে চায় না। কিন্তু এইটুকুই যথেষ্ট মনে হয়।
কারণ এখানে তথ্য না, একটা ধাক্কা আছে—কেউ নিজের ব্যক্তিগত কিছুকে সবার জন্য খুলে দিয়েছিল, এই ভাবনাটাই অস্বস্তির মতো ভেতরে বসে থাকে।
অভিক আর এগোয় না।
সে জানালার দিকে তাকায়। আজ মা দিবস—এই তথ্যটা আলাদা করে মনে করিয়ে দিতে হয় না।
কিন্তু সে নিজে কী করছে?
লিখতে বসেছে। এই জায়গায় এসে একটা চিন্তা মাথায় ঢুকে পড়ে—এই দিনটা না থাকলে, সে কি আজ লিখতে বসত?
প্রশ্নটা তাকে একটু থামায়। সে একটা লাইন লেখে—“মাকে ভালোবাসা জানানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন লাগে না।” লিখেই থামে, তারপর কেটে দেয়।
এই বাক্যটা নিরাপদ। এতে কেউ প্রশ্ন করবে না, কিন্তু এতে তার নিজের কিছু নেই।
সে খালি জায়গাটা ফাঁকা রাখে। কিছুক্ষণ পরে মাথায় খুব নির্দিষ্ট কিছু দৃশ্য ভেসে ওঠে—ভোরে রান্নাঘরের শব্দ, জ্বর হলে কপালে ঠান্ডা হাত, রেজাল্টের দিন ফোনের ওপাশে ফিসফিস করে বলা—“পাশ করেছিস তো?”
অভিক খেয়াল করে, এই স্মৃতিগুলোর জন্য কোনো ব্যাখ্যা লাগে না। এগুলো নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকে।
সে কলম তুলে নেয়, আবার নামিয়ে রাখে। মনে হয়—আর কিছু লিখলে সেটা বাড়তি হয়ে যাবে, আবার মনে হয় কিছু একটা বলা বাকি।
এই মাঝের জায়গাটায় বসে থাকা অস্বস্তিটা সে টের পায়।
চা-টা আরও ঠান্ডা হয়ে গেছে।
রিং বাজে। একবার। দুবার।
ওপাশ থেকে—“হ্যালো?”
অভিক চুপ করে থাকে।
তারপর—“মা…”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।