অন্ধকারে একা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প।এপ্রিল ২২, ২০২৬
অন্ধকারে আমি একা ভিজতে থাকি। এই ভেজার ভেতরে কোনো ঘোষণা নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই—শুধু একটা ধীর, নীরব নামা। মাথার ওপর কোনো মেঘের ছাউনি নেই, নেই কোনো চেনা হাতের স্পর্শ। আকাশটা আজ দূরে সরে গেছে, যেন ইচ্ছা করেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।
শহরটা যখন ঘুমের চাদরে ঢেকে যায়, তখন সবকিছু আলাদা হয়ে পড়ে। দিনের শব্দ, মানুষের মুখ, চলাফেরা—সবই যেন অন্য কারও জীবনের অংশ ছিল। এখন শুধু ভেজা আলো আর থেমে থাকা বাতাস। জানালার কার্নিশ বেয়ে নেমে আসে স্মৃতির জলকণা। খুব ধীরে, খুব নিয়ম মেনে। প্রতিটা ফোঁটা আলাদা কিছু না হলেও একসাথে একটা ভার তৈরি করে, যেটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু টের পাওয়া যায়।
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। বাইরে রাস্তার আলো ভেজা দেয়ালে ছড়িয়ে ভেঙে যাচ্ছে। দূরে একটা কুকুর ডাকছে, তারপর হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। শহর ঘুমায় না শুধু—নিজেকে কিছুটা ভুলেও থাকে। টেবিলে রাখা চায়ের কাপে বৃষ্টির ছাঁট পড়ে ছোট ছোট বৃত্ত তৈরি করছে, যেগুলো কয়েক সেকেন্ড পর আবার মিলিয়ে যায়।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন কোনো পুরনো কথা। এমন কথা, যেটা শেষ হয়নি। শুধু সময়ের কারণে থেমে গেছে। মাটির গন্ধ তখন তীব্র হয়ে ওঠে। সেই গন্ধে মনে হয়—সব স্মৃতি হারিয়ে যায় না, শুধু জায়গা বদলায়।
আমি দাঁড়িয়ে থাকি। ভেতরে বাইরের এই নামা মিশে যায়। ভেজা পোশাক, ভেজা বাতাস, আর ভেতর থেকে ঝরে পড়া একটা স্থিরতা—সবকিছু একসাথে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, এই বৃষ্টি শুধু আকাশ থেকে আসে না। কোথাও ভেতর থেকেও ঝরে। হয়তো তাই প্রতিটা ফোঁটা আলাদা আলাদা অনুভূতির মতো লাগে—কখনো ভারী, কখনো হালকা, কখনো অচেনা।
শহরের আলো এখন কমে এসেছে। দূরের একটা জানালায় এখনো আলো জ্বলছে। কেউ জেগে আছে, বা ঘুম আসছে না। এই ছোট্ট দৃশ্যটা অদ্ভুতভাবে একটা সংযোগ তৈরি করে—আমি একা নই, তবু একা।
তবু একাকীত্ব কমে না। বরং নিজের ভেতরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিছু একাকীত্ব একান্তই নিজের। সেটাকে ব্যাখ্যা করা যায় না, কাউকে দেখানোও যায় না। কিছু অনুভূতি থাকে, যেগুলো ভাষার বাইরে থেকে যায়—শুধু অবস্থান হিসেবে টিকে থাকে।
বাইরে বৃষ্টি এখন একটু বাড়ছে, অথবা তাই ঠেকছে। এই ঠেকা আর আসলে হওয়া—দুটোর মাঝখানেই মনে হয় অনেক কিছু নির্ভর করে।
মনে পড়ে যায় কিছু মুখ, কিছু সময়। খুব স্পষ্টভাবে না, ভাঙা ভাঙা। কোনো কথা, কোনো চুপ থাকা, কোনো অপ্রয়োজনীয় বিরতি। এগুলোকে ঠিক স্মৃতি বলা যায় না, আবার অস্বীকারও করা যায় না।
আমি বুঝতে পারি, কিছু রাতের কোনো সমাধান নেই। কোনো শেষও নেই। এই রাতগুলো শুধু বয়ে যাওয়ার জন্য। তারা মানুষকে অল্প একটু বদলে দেয়, তারপর রেখে যায় নিজের মতো করে।
আমি ভিজি।
আর আমার সাথে ভিজে যায় জমে থাকা অভিমান। না বলা কথাগুলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে যায়, কিন্তু হারিয়ে যায় না। তারা কোথাও থেকে যায়—ভেতরের কোনো কোণে।
এই অন্ধকারের ভেতরে দাঁড়িয়ে কখনো মনে হয়, আমি নিজেকে হারাচ্ছি না। বরং খুব ধীরে, খুব অসম্পূর্ণভাবে নিজেকে আবার চিনতে শুরু করছি। যেন অনেক আগের কোনো সংস্করণ, যেটা এতদিন চুপচাপ ছিল।
বৃষ্টির শব্দ এখন শুধু বাইরে নেই। ভেতরেও আছে। বুকের ভেতর, চিন্তার ভেতর, নীরবতার ভেতর।
কখনো এটা অস্বস্তিকর লাগে, আবার কখনো খুব পরিচিত।
আমি জানালার কাচ থেকে একটু সরে আসি। ভেতরে ফিরে আসার মতো একটা ছোট নড়াচড়া। কাচে আমার হাতের ছাপটা কিছুক্ষণ থাকে, তারপর ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়।
শহর তখনও ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু আমার জানালার সামনে সময় জেগে থাকে। প্রতিটা ফোঁটা পড়ে আর কিছু না বলা কথা রেখে যায়।
আমি জানি না এই বৃষ্টি কখন থামবে। জানি না আমি কখন আবার স্বাভাবিক হয়ে ফিরব।
শুধু জানি — এই মুহূর্তটা পুরোপুরি আমার।
আর এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা একা হওয়াটাই হয়তো আমার সবচেয়ে সত্যিকারের অবস্থা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।