ঘুমহীন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ০২-০৯-২০২৬
রাত প্রায় দুটো।
ঘরের সব আলো নেভানো। শুধু জানালার পাশে ছোট বাতিটা জ্বলছে। তার আলোয় বিছানার একপাশ দেখা যায়, অন্যপাশটা অন্ধকারে।
অভিক চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। ঘুম আসছে না। পাশে নিশি একবার এপাশ, একবার ওপাশ ফিরছে। বালিশটা ঠিক করে নেয়, চোখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খোলে।
অভিক জিজ্ঞেস করল, “ঘুমাওনি?”
“হুম।”
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
অভিক আর কিছু বলল না।
নিশি কথাটা বললেই অভিক বুঝতে পারে, কিছু একটা আছে। গত কয়েক বছরে এই শব্দটার অনেক রকম মানে সে শিখেছে। কখনো সত্যিই কিছু থাকে না। আবার কখনো অনেক কিছু থাকে, শুধু বলার মতো করে সাজানো থাকে না।
কিছুক্ষণ পর নিশি বিছানায় উঠে বসল। পানির বোতলটা হাতে নিয়ে একটু খেল। তারপর বলল,
“কাল কখন বের হবে?”
“সাড়ে আটটার দিকে।”
“ফিরবে?”
“জানি না। কাজ থাকলে দেরি হবে।”
“হুম।”
নিশি আবার শুয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
“আজ বাসা থেকে ফোন করেছিল।”
“কেন?”
“ছোট আপার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
“ও।”
“সবাই যেতে বলছে।”
“যেও।”
নিশি চুপ করে রইল।
অভিক বলল, “কী হলো?”
“গেলে তো প্রশ্ন করবে।”
“কী প্রশ্ন?”
“এই সেই প্রশ্ন।”
অভিক কিছু বলল না।
“কতদিন হলো বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা নেই কেন, কেমন আছ— এসব।”
“তাহলে যেও না।”
নিশি এবার ঘুরে তাকাল।
“তুমি সবকিছুর উত্তর এত সহজে দিয়ে দাও কেন?”
অভিক চুপ।
“যাবে?” বললে “যাও।”
“যাবে না?” বললে “যেও না।”
সবকিছু কি এত সহজ?”
“আমি কী বলব?”
“আমি জানি না।”
ঘরটা আবার চুপ হয়ে গেল।
এই চুপচাপ থাকা তাদের নতুন কিছু নয়।
সকালে নিশি রান্নাঘরে থাকে, অভিক খবরের কাগজ পড়ে। দুপুরে যার যার কাজ। রাতে একই বিছানায় শুয়ে দুজন দুই দিকে মুখ করে থাকে। সংসার চলছে। বাজার হচ্ছে, বিল দেওয়া হচ্ছে, কাপড় ধোয়া হচ্ছে। শুধু কথাগুলো কমে গেছে।
আগে রাতে ঘুমানোর আগে কত কথা হতো। অফিসের মানুষজন, পাশের বাসার ঝামেলা, কে কী বলল, কোথায় বেড়াতে যাবে—কত কিছু। এখন প্রয়োজন ছাড়া কথা হয় না। দরকার হলে বলে, “লবণটা দেবে?” “কাল বিলটা দিয়ে দিও।” “ফ্রিজে সবজি আছে।”
কথা শেষ।
দুই বছর ধরে তাদের মধ্যে বড় কোনো ঝগড়া হয়নি। কিন্তু বড় কোনো ভালো কথাও হয়নি।
একসময় নিশি বলল,
“তুমি কি আমার সঙ্গে এখনো থাকতে চাও?”
অভিক একটু নড়েচড়ে শুল।
“চাই।”
“তাহলে এত দূরে থাকো কেন?”
অভিক নিশির দিকে তাকাল।
কী বলবে, সে জানে না।
নিশির চোখ দুটো লাল, ঘুমহীন। অভিক এবার স্পষ্ট দেখল।
নিশি বলল, “আমি ক্লান্ত, অভিক।”
“জানি।”
“না, জানো না।”
অভিক চুপ করে রইল।
“আমি সারাদিন তোমার পাশে থাকি। অথচ মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার কাছে পৌঁছাতে আমার অনেক দূর হাঁটতে হয়।”
অভিক ধীরে বলল, “আমারও তাই মনে হয়।”
নিশি আর কিছু বলল না।
জানালার বাইরে কোনো গাড়ি চলে গেল। আলোটা কিছুক্ষণের জন্য পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরের দেয়ালে এসে পড়ল, তারপর মিলিয়ে গেল।
অভিক বুঝতে পারল, এতদিন ধরে তারা দুজনেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কোথাও যায়নি। তবু মাঝখানে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সে বলল,
“আমি দুঃখিত।”
নিশি বলল,
“কিসের জন্য?”
অভিক উত্তর দিল না।
নিশি আবার শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর বলল, “তুমি কখনো কিছু বলতে চাও?”
“চাই।”
“তাহলে বলো না কেন?”
অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “সব কথা বলা যায় না।”
নিশি আর প্রশ্ন করল না।
ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোতে থাকল।
দুজনেই বিছানায় শুয়ে রইল। মাঝখানে আগের মতোই একটা জায়গা পড়ে রইল। খুব বেশি নয়। একজন হাত বাড়ালে হয়তো পৌঁছে যাওয়া যায়।
কেউ হাত বাড়াল না।
আজও তাদের মাঝখানে আগের মতোই একটু জায়গা রয়ে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।