অন্যরকম শিশু
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ২৯ মে, ২০২৬
ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসে থাকা ছেলেটার নাম রায়ান। স্কুল ড্রেসের উপরের বোতামটা প্রায়ই খোলা থাকে। টিফিন বক্সটা সে সব সময় ব্যাগের ডান পাশে রাখে। কেউ ভুল করে সরিয়ে দিলে সে চুপচাপ আবার আগের জায়গায় রেখে দেয়।
শিক্ষক প্রশ্ন করলে বেশিরভাগ সময় সে মাথা নিচু করে থাকে। অনেকেই ভাবে, ছেলেটা অহংকারী। পেছনের বেঞ্চ থেকে মাঝেমধ্যে ফিসফিস শব্দ ভেসে আসে, “ও একটু অদ্ভুত।”
রায়ান এসবের কোনো উত্তর দেয় না। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে, কখনো জানালার বাইরে। হঠাৎ ঘণ্টা বাজলে সে কেঁপে ওঠে। প্রার্থনার সময় মাইকের শব্দ বেড়ে গেলে দুই কান চেপে ধরে।
খেলাধুলার ভিড় এড়িয়ে করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্যরা যখন হৈচৈ করে মাঠে দৌড়ায়, সে তখন নিজের ছোট নীল খেলনা গাড়িটার চাকা ঘুরায় আঙুল দিয়ে। একই দিকে। বারবার।
টিফিনের সময় ক্লাসরুম প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। বেঞ্চের ওপর রোদ এসে পড়ে। ধুলোর ভেতর ছোট ছোট আলোর দাগ ভাসতে থাকে। রায়ান তখন টেবিলের ওপর গাড়িটা চালায় ধীরে ধীরে। কোনো শব্দ করে না। শুধু চাকার ঘূর্ণনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
একদিন শুভ আর রাফি মজা করার জন্য গাড়িটা লুকিয়ে ফেলল। গাড়িটা তারা জানালার পাশে পর্দার আড়ালে রেখে দিয়েছিল। তাদের কাছে এটা ছিল খুব সাধারণ দুষ্টুমি। কয়েক মিনিটের হাসাহাসি।
কিন্তু রায়ান প্রথমে স্থির হয়ে গেল। তারপর দ্রুত চারদিকে তাকাতে লাগল। বেঞ্চের নিচে দেখল। ব্যাগ খুলল। টেবিলের ওপর হাত বুলাল বারবার। যেন জিনিসটা হঠাৎ বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ পরে সে দুই কান চেপে মেঝেতে বসে পড়ল। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট শব্দ বের হচ্ছিল। ক্লাসের কয়েকজন হেসে ফেলল।
রাফি বলল,
“এতটুকু জিনিস নিয়ে কেউ এমন করে নাকি!”
ঠিক তখন আয়েশা ম্যাডাম ভেতরে ঢুকলেন। তিনি কিছুক্ষণ কিছু বললেন না। শুধু রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে নিচু হয়ে বসলেন তার পাশে।
“গাড়িটা হারায়নি,” তিনি আস্তে বললেন।
“দেখি কোথায় রেখেছে।”
তার গলার স্বর খুব নিচু ছিল। প্রায় ফিসফিসের মতো। ক্লাসরুম তখন অদ্ভুত চুপচাপ। বাইরে মাঠে বাচ্চারা চিৎকার করছে, তবু ভেতরের বাতাস ভারী লাগছিল।
কয়েক মিনিট পরে শুভ চুপচাপ গাড়িটা এনে টেবিলের ওপর রাখল। রায়ান সঙ্গে সঙ্গে সেটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে ফেলল। যেন ছোট্ট প্লাস্টিকের খেলনা না, নিরাপদ একটা জায়গা।
সেদিন ছুটির পরে রায়ানের মা স্কুলে এসেছিলেন। হালকা নীল ওড়নাটা বারবার কাঁধ থেকে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি সেটা ঠিক করতে করতে আয়েশা ম্যাডামের সামনে বসেছিলেন। মুখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির চেয়েও বেশি ছিল সাবধানে কথা বলার অভ্যাস।
“ও সব বোঝে,” তিনি বললেন।
“শুধু সবাই যেভাবে বোঝে, সেভাবে দেখাতে পারে না।”
আয়েশা ম্যাডাম চুপচাপ শুনছিলেন। করিডোর দিয়ে তখন বাচ্চারা ছুটছিল। সিঁড়িতে জুতোর ধুপধাপ আওয়াজ।
“মানুষ ওকে দেখে মায়া দেখায়,” রায়ানের মা বললেন।
“আমি মায়া চাই না। আমি চাই, ওকে মানুষ হিসেবে দেখুক।”
কথাটা বলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
রায়ান তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার আঙুল ধীরে ধীরে গাড়িটার চাকা ঘুরাচ্ছিল। বাইরের বিকেলের আলো এসে তার মুখে পড়ছিল। সে কারও দিকে তাকাচ্ছিল না। তবু আশপাশের সব শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছিল।
পরের সপ্তাহে একটা ছোট ঘটনা ঘটল। টিফিনের সময় তমাল এসে রায়ানের পাশে বসেছিল। সে কিছু বলেনি। শুধু ব্যাগ থেকে একটা লাল ক্রেয়ন বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
রায়ান প্রথমে ক্রেয়নটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নীল গাড়িটা ঘুরাতে লাগল। তমালও চুপচাপ বসে ছিল।
সেদিন টিফিনের পুরো সময় নীল গাড়িটার পাশে লাল ক্রেয়নটা পড়ে ছিল। দুজনে কেউ কোনো কথা বলেনি।
বাইরে ছুটির ঘণ্টা বাজছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।