ভেজা দেশলাই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৯ অক্টোবর ২০২৬
দেশলাইয়ের বাক্সটা ছুড়ে ফেলতে গিয়েও রফিক থেমে গেল।
বাক্সটা ভিজে নরম হয়ে গেছে। এক পাশ ফেটে ভেতরের কাঠিগুলো দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা কালচে, কয়েকটা ফুলে উঠেছে। রান্নাঘরের দরজার পাশে পড়ে ছিল। মিতু স্কুল থেকে ফিরে ভেজা জুতো খুলতে গিয়ে ওটা কুড়িয়ে এনেছে।
মিতু জিজ্ঞেস করল, বাবা, এটা দিয়ে আগুন জ্বলবে?
রফিক খাতা থেকে চোখ না তুলেই বলল, ভেজা জিনিস দিয়ে আগুন জ্বলে নাকি?
তাহলে ফেলে দিই?
যা খুশি কর।
কথাটা বলেই রফিক বুঝল, মেয়েটার ওপর রাগ দেখানোর দরকার ছিল না। কিন্তু দুঃখ প্রকাশ করল না। ঘরে চাল কম, দোকানের ভাড়া বাকি, মিতুর স্কুলের বেতন দুই মাস ধরে দেওয়া হয়নি। সকাল থেকে দোকানে বিক্রি হয়েছে একশ বিশ টাকা। তার মধ্যে চল্লিশ টাকা দিয়ে চা-বিস্কুট খেয়েছে। দুপুরে খাওয়া হয়নি।
ক্যাশ বাক্স খুলে সে আবার টাকাগুলো গুনল। তিনটা দশ টাকার নোট, চারটা পাঁচ টাকার কয়েন আর দুটো লজেন্স। একটা লজেন্সের মোড়ক ইঁদুরে কেটেছে।
স্কুলের বেতন দেওয়ার শেষ তারিখ আজ।
মিতুর ব্যাগের চেইনটা নষ্ট। ভেতর থেকে খাতার কোণা বেরিয়ে আছে। মেয়েটা প্রতিদিন ব্যাগটা বুকের কাছে চেপে ধরে স্কুলে যায়, যেন কেউ ছেঁড়া জায়গাটা দেখে ফেললে তার খুব লজ্জা হবে।
স্কুলের জুতোর সামনের দিকে সেলাই খুলে গেছে। হাঁটার সময় ফাঁকটা একটু একটু করে খুলে যায়, ভেতর থেকে মোজার ময়লা কাপড় দেখা যায়। মিতু জুতোর ওপর পা ঘষে ফাঁকটা ঢাকার চেষ্টা করে।
রফিক খাতার নিচে রাখা বেতনের কাগজটা বের করল। কাগজের ওপর লাল কালিতে লেখা, ‘বকেয়া পরিশোধ করুন’।
সে কাগজটা আবার ভাঁজ করে রাখল।
সন্ধ্যার একটু আগে কাদের সাহেব দোকানে এলেন। পাশের গলিতে তাঁর মুদি দোকান। রফিকের দোকানে আগে বাকিতে চা খেতেন। এখন আর খান না। দুজনের মধ্যে কথা হয়, কিন্তু আগের মতো নয়। গত মাসে কাদের সাহেবের কাছ থেকে পাঁচশ টাকা ধার নিয়ে রফিক নির্ধারিত দিনে ফেরত দিতে পারেনি।
বেঞ্চে বসে কাদের সাহেব জানতে চাইলেন, স্কুলে মেয়ের বেতন দিয়েছেন?
রফিক খাতা বন্ধ করল।
আপনার টাকা কাল দেব।
আমি টাকার কথা বলিনি।
কিন্তু আপনি বলবেন। সবাই বলে।
কাদের সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর পকেট থেকে কয়েকটা নোট বের করে কাউন্টারে রাখলেন।
মেয়ের বেতনটা দিয়ে দিয়েন। পরে সুবিধা হলে ফেরত দেবেন।
রফিক টাকাগুলোর দিকে তাকাল না।
আমার মেয়ের বেতন আমি দিতে পারব।
কথাটা বলার পরই তার মনে পড়ল, সকালে মিতু জিজ্ঞেস করেছিল, স্কুলে বেতন না দিলে কি তাকে ক্লাসে ঢুকতে দেবে না। সে তখন ধমক দিয়ে বলেছিল, এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না।
কাদের সাহেব টাকাগুলো তুলে নিলেন না।
আপনি না নিলে আমি নিয়ে যাব। কিন্তু একটা কথা বলি, রফিক ভাই, ধার চাইলে মানুষ ছোট হয় না। টাকা নিয়ে পালালে ছোট হয়।
রফিকের মুখ গরম হয়ে উঠল।
আমি পালাইনি।
জানি।
এই ‘জানি’ কথাটাই তার বেশি খারাপ লাগল। যেন কাদের সাহেব তাকে বিশ্বাস করছেন, অথচ বিশ্বাস করার মতো কিছুই তার হাতে নেই।
কিছুক্ষণ পর তিনি চলে গেলেন। টাকাগুলো কাউন্টারে পড়ে রইল।
রফিক অনেকক্ষণ সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর নোটগুলো তুলে নিজের পকেটে রাখল। মনে হলো, পকেটটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে।
রাতে মিতু ভাত খেতে বসে বলল, বাবা, কাল স্কুলে টাকা না দিলে ম্যাডাম আবার দাঁড় করিয়ে রাখবেন।
রফিকের হাত থেমে গেল।
তোমাকে কে বলেছে?
গতবার তো দাঁড় করিয়েছিলেন। তুমি ভুলে গেছ?
রফিক কিছু বলল না। মেয়েটা ভাতের সঙ্গে আলু মাখছিল। রফিক তার থালায় একটু ঝোল বাড়িয়ে দিল। তারপর নিজের থালার ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দেখেও খেতে শুরু করল না।
খাওয়া শেষে মিতু ভেজা দেশলাইয়ের বাক্সটা এনে টেবিলে রাখল।
এটা শুকিয়েছে একটু।
রফিক বাক্সটা হাতে নিল। ভেতরের কাঠিগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে আছে। সে একটা কাঠি বের করে দেয়ালের খসখসে অংশে ঘষল।
কিছুই হলো না।
আরেকটা কাঠি নিল। ঘষতেই কাঠির মাথা ভেঙে গেল। কালো গুঁড়ো আঙুলে লেগে রইল।
থাক বাবা। নষ্ট হয়ে গেছে।
রফিক বাক্সটা বন্ধ করল। তারপর উঠে রান্নাঘর থেকে শুকনো দেশলাইয়ের নতুন বাক্সটা নিয়ে এল। সেটা পুরোনো টিনের কৌটায় রাখা ছিল। শেষ কয়েকটা কাঠি বাকি।
একটা কাঠি জ্বালিয়ে সে টেবিলের ওপর রাখা মোমবাতিতে আগুন ধরাল।
মিতু আলোয় খাতাটা খুলে বসে পড়ল। রফিক ভেজা বাক্সটা হাতে নিয়ে বারান্দায় গেল। বৃষ্টির পানি জমে থাকা নর্দমায় ছুড়ে ফেলতে গিয়েও সে থামল। বাক্সটার গায়ে মিতুর আঙুলের ছাপ লেগে আছে, কাদার মধ্যে মুছে যাওয়া কয়েকটা অক্ষরও।
সে বাক্সটা জানালার কার্নিশে রেখে দিল।
তারপর পকেট থেকে কাদের সাহেবের দেওয়া টাকা বের করল। পাঁচশ টাকার নোটটা আলাদা করে রাখল। বাকি টাকা গুনে দেখল, স্কুলের বেতন দেওয়ার পরও কিছু থাকবে। খুব বেশি নয়।
পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে মিতু বলল, বাবা, আমার ব্যাগের চেইনটা সেলাই করে দেবে?
রফিক তার দিকে তাকাল। মেয়েটা ব্যাগের ছেঁড়া মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে।
দেব।
আজই?
রফিক উত্তর দেওয়ার আগে পকেটে হাত দিল। টাকাগুলো আছে। তবু সবকিছু একসঙ্গে হবে না।
আজ না। শুক্রবারে।
মিতু মুখটা একটু নামিয়ে নিল। তারপর ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে এগোল। জুতোর সামনের ফাঁকটা আবার খুলে গেছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে পায়ের আঙুল গুটিয়ে জুতোর মুখটা বন্ধ করার চেষ্টা করল।
রফিক ডাকল, শোন, বেতনের টাকা আজ দিয়ে আসব।
মিতু ফিরে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। হাসল না। শুধু বলল, আচ্ছা।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর রফিক জানালার কার্নিশ থেকে ভেজা দেশলাইয়ের বাক্সটা নামাল। বাক্সটা শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে, কিন্তু ভেতরের কাঠিগুলো আর জ্বলবে না।
সে বাক্সটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
পকেটে কাদের সাহেবের টাকা। সকালে দোকানের বাকি, বিকেলে স্কুলের বেতন। হিসাবগুলো মাথার মধ্যে ঘুরছিল। শাটারের তালায় চাবি ঢুকিয়ে রফিক টান দিল।
শাটারটা উঠল, কিন্তু শব্দটা আজ তার কাছে অন্য দিনের চেয়ে ভারী মনে হলো।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।