চশমার খাপ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৩, ২০২৬
ভালোবাসা হয়তো অভ্যাসের মতো—ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
এই অভ্যাসের প্রথম মানুষটা বাবা।
বাবাকে আমরা একজন মানুষ হিসেবেই দেখি। কিন্তু অভিজ্ঞতা অন্য কিছু ইঙ্গিত করে। অনেক সময় তিনি এমন এক উপস্থিতি, যাকে আলাদা করে টের পাওয়া যায় না—তবুও বিপদের মুহূর্তে বোঝা যায়, কোথায় তাঁর ভূমিকা ছিল। হয়তো তিনি আগেভাগেই সমস্যাগুলো ঠেকিয়ে দেন, কিংবা ভয় পাওয়ার আগেই একটা ভরসার জায়গা তৈরি করে রাখেন। তাঁর ক্লান্তি ছিল—এখন বুঝি। তখন বুঝতাম না।
বড় হতে হতে আমরা যুক্তি শিখি, হিসেব কষি। তবুও একটা জায়গায় এসে সবকিছু থেমে যায়—যখন বুঝতে হয়, যাকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভেবেছিলাম, তাকেও হারাতে হয়।
সময় কিছু জোড়া লাগায় না; বরং ভাঙা অবস্থাটাকেই সহনীয় করে তোলে।
একদিন সেই ছায়া সরে যায়। ঘর থাকে, মানুষ থাকে, দিনের আলোও কমে না। শুধু একটা ফাঁক তৈরি হয়—যেটা চোখে পড়ে না, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তখন স্মৃতি ভরসা দেয়, আবার একই সঙ্গে চাপে রাখে।
প্রিয় বাবা,
তুমি চলে যাওয়ার দিনটা নিয়ে লিখতে বসলে এখনো হাত থেমে যায়। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। অথচ আমার ভেতরে তখন কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছিল। মনে হয়েছিল, ভরসার জায়গাটা হঠাৎ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দাঁড়িয়ে আছি—কিন্তু স্থির না।
পাঁচ বছর হয়ে গেছে। এই সময়ের ভেতরে অনেক কিছু বদলেছে। অফিসে প্রমোশন পেয়েছি। ছোট ভাইটা এখন নিজে সিদ্ধান্ত নেয়, আগের মতো আমার দিকে তাকিয়ে থাকে না। ঘরের পুরোনো আলমারিটাও বদলে গেছে। শুধু একটা জিনিস একই আছে—তোমার জায়গাটা ফাঁকা।
সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। অফিস থেকে ফিরে ট্রফিটা টেবিলে রাখছিলাম। হঠাৎ চোখ গেল তোমার পুরোনো চশমার খাপটার দিকে—যেটা কেউ ফেলে দেয়নি, আবার কেউ ব্যবহারও করে না। হাতটা থেমে গিয়েছিল। খুব ছোট একটা মুহূর্ত। কিন্তু তখনই প্রথমবার মনে হলো—এই খবরটা দেওয়ার কেউ নেই।
তুমি যখন গ্রামের বাড়ি যেতে, আমি অস্থির হয়ে উঠতাম। অকারণে ফোন দিতাম—“সব ঠিক তো?” তুমি হেসে বলতে—“আমি আছি।” এখনো ফোন বেজে উঠলে মাঝে মাঝে ভুল হয়। এক সেকেন্ড। তারপর বুঝি—না, তুমি না।
বাবা, আমি চেষ্টা করছি। তোমার মতো শক্ত হতে পারিনি—এটা মেনে নিয়েছি। তবে ভেঙে পড়াটাকে আড়াল করতে শিখেছি। ছোট ভাইদের দেখাশোনা করছি। সব ঠিক করছি কি না—নিশ্চিত নই। মাঝে মাঝে রাগও হয়। তোমার ওপর। এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়ার জন্য। তারপর আবার সেই রাগটাই অস্বস্তিকর লাগে।
রাতের দিকে বিষয়টা বেশি স্পষ্ট হয়। চারপাশ নিঃশব্দ হয়ে গেলে মনে হয়—একবার যদি তোমার পাশে বসতে পারতাম। কোনো কথা না বলেও অনেক কিছু বলা যেত। কখনো কল্পনায় তোমার কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে—“ভয় পাস না, আমি আছি।” এই ‘আছি’ শব্দটা এখন আর বাস্তবে নেই—এটাই মেনে নেওয়া কঠিন।
শহরের ভিড়ে থেকেও একটা বিচ্ছিন্নতা কাজ করে। মানুষ আছে, কাজ আছে। জীবন থেমে নেই। তবুও একটা জায়গা খালি।
আগে ছোট কিছু পেলেও তোমাকে বলতাম। এখন বড় কিছু হলেও বলার জায়গাটা ফাঁকা থাকে। মাঝে মাঝে মনে মনে তোমার সঙ্গে কথা বলি। কোনো সিদ্ধান্তের আগে থেমে যাই—ভাবি, তুমি কী বলতে? সবসময় উত্তর পাই না।
তুমি যে শিক্ষা দিয়ে গেছ, সেগুলো এখনো টিকে আছে। পুরোপুরি পালন করতে পারছি কি না—সন্দেহ আছে। তবুও এগুলো ছাড়া এগোনো কঠিন। তুমি বলেছিলে, ভয় পেলেও থামা যাবে না। হারলে সেটা মেনে নিতে হবে। ভালোবাসা মানে দায়িত্বও।
তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যায়—মানুষ কি আসলে কাউকে ভুলে যায়?
তোমাকে আলাদা করে মনে করার দরকার হয় না। তুমি এমনিতেই থেকে যাও—চিন্তার মধ্যে, অভ্যাসের মধ্যে। আজও বেঁচে আছি। কিন্তু পুরোটা না।
কখনো কান্না আসে। কখনো আসে না।
ট্রফিটা টেবিলেই পড়ে রইল।
চশমার খাপটা তুলে রাখলাম।
—তোমার সন্তান
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।