ফাটলের ভেতর আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৬ জুলাই, ২০২৬
ঝনঝন। মাটির ফুলদানিটা বারান্দার মেঝেতে পড়ে তিন টুকরো হয়ে গেল। নিশি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু হয়ে টুকরোগুলো হাতে তুলে আবার ছেড়ে দিল। — থাক... ফেলে দাও। আর হবে না। অভিক কোনো কথা বলল না। শুধু একটা পুরোনো কৌটায় সব টুকরো তুলে রেখে দিল।
সেই রাতেই অফিস থেকে ফিরে কৌটাটা আবার বের করল। ডাইনিং টেবিলের ওপর খবরের কাগজ বিছিয়ে এক একটা টুকরো মিলিয়ে দেখছে। আঠা লাগাচ্ছে। আবার ধরে রাখছে। রান্নাঘর থেকে নিশি দেখে হেসে বলল, — তুমি না একেবারে পাগল। নতুন একটা কিনলেই তো হয়। অভিক চোখ না তুলেই বলল, — সবকিছুর বদলি হয় না। কথাটা শুনে নিশির হঠাৎ কয়েক মাস আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়ল।
তখন এই বাড়িটাও যেন অন্যরকম ছিল। রাত দশটা। খাবার টেবিলে দুটো প্লেট। মাঝখানে একটা ফোন। নিশি বলল, — লবণটা দাও। অভিক এগিয়ে দিল। তারপর আবার নীরবতা। ফ্যান ঘুরছিল। চামচের শব্দ হচ্ছিল। দুজন মানুষের মধ্যে আর কিছু হচ্ছিল না। একদিন বিরক্ত হয়ে নিশি প্লেটটা একটু জোরেই নামিয়ে রাখল। — এভাবে আর কত? অভিক মাথা তুলেছিল। কিন্তু উত্তর দেয়নি। সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি ওর। কখন যে কথাগুলো কমে গেছে, কখন যে পাশাপাশি থেকেও তারা এত দূরে চলে গেছে, সেটা ও নিজেও বুঝতে পারেনি।
পরদিন থেকে বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ক্ষমাও চায়নি নাটক করে। শুধু ছোট ছোট কিছু বদল এনেছিল। ফেরার পথে বেলি ফুল নিয়ে এসেছে। রাতে ফোনটা উল্টে রেখে বলেছে, — আজ তোমার দিনটা কেমন গেল? নিশির মাথা ধরলে চুপচাপ চা বানিয়ে দিয়েছে। ছুটির সকালে বাজারে যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছে, — কিছু আনব? প্রথম প্রথম নিশি ভেবেছিল, দুদিনের ঢং। তারপর সব আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু হলো না।
একদিন অভিক জ্বর নিয়েও অফিসে গেল। ফিরে এসে নিজের ওষুধ খাওয়ার আগেই নিশির জন্য গরম পানি করে দিল। সেদিন নিশির বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। হয়তো মানুষটা সত্যিই বদলাতে চাইছে। হয়তো সত্যিই হারানোর ভয় পেয়েছে। তারপর মাস কেটে গেল। প্রতিদিন তেমন কিছু ঘটেনি। তবু একদিন দেখা গেল, অভিকের আনা বেলি ফুলগুলো আর টেবিলে শুকিয়ে পড়ে নেই। নিশি সেগুলো খোঁপায় গুঁজে নিয়েছে। কিছু বলেনি। শুধু চায়ের কাপে চিনি দিয়েছে দুই চামচ। অভিক যেভাবে খায়।
শেষ পর্যন্ত ফুলদানিটা জোড়া লাগল। আগের মতো হয়নি। ফাটলের দাগগুলো স্পষ্ট। নিশি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখল। আঙুল দিয়ে একটা দাগ ছুঁয়ে বলল, — ঢেকে দিতে পারতে। অভিক হালকা হেসে মাথা নাড়ল। — থাক। থাক না। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বারান্দার বাইরে বাতাস উঠেছে। দূরে কারও বাড়ি থেকে ভাতের গন্ধ আসছে। নিশি আস্তে করে ফুলদানিটা টেবিলের ওপর রেখে অভিকের পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর কোনো কথা না বলে ওর কাঁধে মাথা রাখল। অভিকও কিছু বলল না।
বারান্দার টেবিলে ভাঙা ফুলদানিটার ভেতর কয়েকটা টাটকা বেলি ফুল। বাতাস লাগতেই ফুলগুলো দুলে উঠল। ফুলদানিটাও হালকা টুং করে উঠল। ভাঙা। তবু বাজছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।