এক ফোঁটা চোখের জল
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ ছোটগল্প (বাস্তব কাহিনির ভিত্তিতে)
তারিখঃ ১৫ অক্টোবর ২০২৫
আজ বহুদিন হলো অভিকের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
জীবনের নানান ব্যস্ততায় সময় যেন হাতছাড়া হয়ে যায় প্রতিদিনই।
আজ শনিবার—ভাবলাম, একটু সময় বের করে ওর সঙ্গে দেখা করি।
বিকেলের দিকে অভিককে ফোন করলাম। ঠিক হলো, দেখা করব এক মার্কেটের সামনে।
অল্প অপেক্ষার পরেই দেখি, আগের মতোই হাসিমুখে অভিক আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
কথাবার্তা চলল—হালকা, সাধারণ, অথচ অজানায় ভরা।
তারপর দু’জনে মিলে পাশের হোটেলে চা খেতে গেলাম।
আমাদের সামনে গরম ধোঁয়া ওঠা দু’কাপ চা।
অভিক হাত বাড়িয়ে কাপটা নিতে যেতেই চোখ আটকে গেল তার হাতে,
ফোলা ফোলা, ভারী, যেন কোনো অদৃশ্য যন্ত্রণা জমে আছে সেখানে।
ভালো করে তাকিয়ে দেখি, মুখটাও ফুলে আছে, চোখদুটো লালচে ও ক্লান্ত।
আমি ওর হাতটা ধরে বললাম—“অভিক, কী হয়েছে তোর?”
সে হেসে কিছু না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর নিঃশ্বাস ফেলে বলল—“গতকাল যা ঘটেছে, তুই শুনলে অবাক হবি…”
কদিন ধরে অভিকের শরীর ভালো যাচ্ছিল না।
মাথায় তীব্র ব্যথা, চোখ ঝাপসা, শরীর ভারী।
বিকেলে একটু বিশ্রাম নিতে গিয়েছিল।
মাগরিবের আজানে ঘুম ভেঙে নামাজ পড়ে ফিরে এল বাসায়। এরপর থেকেই শরীরটা আরও খারাপ লাগতে শুরু করল।
এমন সময় এক বন্ধু ফোন করে বলল,
“চল, একটু ফুড কর্নারে বসি।”
প্রথমে যেতে চায়নি, কিন্তু বন্ধুটি বারবার ফোন করায় শেষে রাজি হলো।
রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখে, আরেক বন্ধু আগেই বসে আছে। কথা হচ্ছিল, হাসাহাসি চলছিল।
ঠিক পাশের টেবিলে বসে একদল লোক বিরিয়ানির অর্ডার দিয়েছে।
অল্প পরেই এল গরম ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানির বড় ডিশ।
অভিকের দৃষ্টি আটকে গেল সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে।
হঠাৎ মনে হলো—সেই ধোঁয়ার ভেতর হাসছে তার ছোট মেয়ে, পরী।
একদম নিষ্পাপ মুখ, বিরিয়ানির গন্ধের মতোই উষ্ণ।
পরী বিরিয়ানি ভালোবাসে—এটা অভিক জানে।
কিন্তু শেষ কবে পরীকে বিরিয়ানি কিনে দিয়েছে, তা মনে করতে পারল না।
বুকটা হঠাৎ কেমন ভার হয়ে গেল।
চোখ জ্বালাপোড়া করছে, গলা শুকিয়ে আসছে।
কিছু বলতে পারছিল না, আবার সহ্যও করতে পারছিল না।
তবুও সমাজের নিয়ম আছে—সব অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু হঠাৎই নিজের অজান্তে এক ফোঁটা জল ঝরে পড়ল অভিকের হাতের তালুতে।
চুপিচুপি মুছে নিল—কেউ টের পেল না কিছু।
এরপর আরও বন্ধুরা এল, হাসাহাসি চলল, আড্ডা জমল।
কিন্তু অভিকের মন পড়ে রইল ধোঁয়ার মধ্যে দেখা সেই মুখে। রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। মাথার মধ্যে ঘুরছে একটাই চিন্তা— বাসায় খাবার নেই।
পকেটে আছে সামান্য কিছু টাকা—ঔষধ কেনার জন্য রাখা। ডাক্তার বলেছেন, একদিনও ঔষধ বন্ধ করা চলবে না, না হলে ফুসফুসে পানি বেড়ে যাবে।
কিন্তু বাবা তো শেষ পর্যন্ত বাবা-ই।
অভিক আর স্থির থাকতে পারল না। ঔষধের টাকা দিয়েই কিনল দুই প্যাকেট বিরিয়ানি—পরীর জন্য।
দোকানের উজ্জ্বল আলোয় ঘাম টপটপ করে পড়ছিল তার মুখ থেকে, দেহে তখন দুর্বলতা, তবু মনে অদ্ভুত এক তৃপ্তি।
বাড়ি ফিরে দেখে, পরী এখনো ঘুমায়নি।
অভিক মেয়ের হাতে বিরিয়ানির প্যাকেট তুলে দিতেই পরীর চোখে আনন্দের ঝিলিক—যেন ছোট এক উৎসব।
“বাবা, বিরিয়ানি তুমি কোথায় পেলে?”
অভিকের চোখে জল চিকচিক করছে, তবু হেসে বলল—“বাবা আছে তো।”
পরী খেতে লাগল পরম আনন্দে। অভিক চুপচাপ গোসল সেরে বিছানায় এল। শরীর তখন নিস্তেজ, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। অক্সিজেনের মাত্রা ৭০ থেকে ৭৮—বন্ধুরা হাসপাতালে নিয়ে গেল।
প্রথম হাসপাতাল বলল—“হার্ট হাসপাতালে নিন।”
কিন্তু সেখানে খরচ অনেক। অভিক চুপ করে গেল।
“সব আল্লাহর হাতে,” বলেই ফিরে এল বাসায়।
ভোরবেলায় শরীর আরও খারাপ হলো।
টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছিল, কিন্তু দেহ সাড়া দিল না আর। ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে গেল অভিক।
দূরে কোথাও তখন ভেসে আসছে বিরিয়ানির গন্ধ—
যে গন্ধে ছিল পরীর হাসি, আর অভিকের শেষ নিঃশ্বাসের স্মৃতি।
আমি স্থবির হয়ে গেলাম ওর কথা শুনে।
হঠাৎ টের পেলাম—আমার চোখ দিয়েও
এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছে অভিকের ফোলা হাতের তালুর উপর।
#একফোঁটা_চোখের_জল #মানবিকগল্প #বাস্তবকাহিনি #পিতারভালোবাসা #ত্যাগ #দারিদ্র্যওমমতা #জীবনেরবাস্তবতা #বাবাএবংমেয়ে #বাংলাসাহিত্য #MohammadZahidHossain #EmotionalStory #TrueLifeTale #FatherDaughterBond #TearsOfLove #HumanityInWords #enolej_idea
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।