ঈদের চাঁদের আগেই ভেঙে পড়া রাত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৬ মে, ২০২৬
আপনারা যারা নিয়মিত আমার লেখা পড়েন, তারা অভিকের অবস্থাটা জানেন। তবু নতুন করে বলি—অভিক খুব সাধারণ একজন মানুষ।
অনেকদিন ধরেই সে হার্টের জটিল রোগে ভুগছে। তারপরও একটা বেসরকারি চাকরি করে কোনোভাবে সংসার টিকিয়ে রেখেছিল। গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিল। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাকই লাগত।
ভেতরে শুধু অভিক জানত—সে আসলে ঠিক নেই।
কিছুদিন হলো চাকরিটাও নেই। এখন সে একেবারেই বেকার।
ঈদ আসছে। চারদিকে উৎসবের প্রস্তুতি, গরুর হাটের আলোচনা, নতুন জামার ভিড়, মানুষের ব্যস্ত হাসি।
আর অভিকের ভেতরে শুধু একটা চাপা হিসাব—এই ঈদের দিনটা কীভাবে যাবে।
দুটি সন্তান নিয়ে দিন কাটানো এখন হিসাবের মতো। হাসি কমে গেছে, প্রয়োজন বেড়েছে।
কিছু পরিচিত মানুষ সাহায্য করেছে, না হলে এই দিনগুলো টানা সম্ভব হতো না।
তবু সবচেয়ে কঠিন লাগে বিকেলগুলো।
অভিকের ছোট মেয়েটা বারবার কিছু চায়। ঈদের জামা, নতুন কিছু, আর সবচেয়ে বেশি—গরু দেখার কথা।
গত কয়েকদিন ধরে সে বারবার বলে,
“আব্বু, আমরা কি এবার গরুর হাটে যাব?”
অভিক চুপ করে থাকে।
কারণ সে জানে, হাটে গেলে শুধু গরু দেখা হবে না—ওদের চোখে আরও অনেক প্রশ্ন জন্ম নেবে।
একদিন হাটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অভিক আর মেয়েরা থেমে গিয়েছিল।
দুটি মেয়েই অপলক তাকিয়ে ছিল বিশাল একটা গরুর দিকে। গরুর গলায় ঘণ্টার শব্দ, চারপাশে মানুষের ভিড়, দরদাম, হাসি—সব মিলিয়ে ওদের চোখে এক ধরনের বিস্ময়।
ছোট মেয়েটা খুব আস্তে বলেছিল,
“আব্বু, এটা কি আমাদের হবে?”
অভিক কিছু বলতে পারেনি। শুধু হাতটা শক্ত করে ধরেছিল।
বাসায় ফিরে বড় মেয়ে চুপচাপ বসে ছিল। কিছু বলল না, কিন্তু অভিক বুঝতে পারছিল, ওর চোখে একটা অদৃশ্য বোঝাপড়া জন্ম নিচ্ছে—এই ঈদটা আগের মতো হবে না।
একসময় ঈদের দিন তাদের ঘরে গরুর মাংস রান্না হতো। ঘ্রাণে পুরো ঘর ভরে যেত।
আজকাল সেই ঘ্রাণও অনেক দূরের গল্প।
কখনো কখনো পাশের বাসা থেকে মাংস রান্নার গন্ধ আসে।
ছোট মেয়েটা নাক টানে। বলে,
“আব্বু, আমাদের বাসায় এমন গন্ধ কেন আসে না?”
অভিক বলে,
“আসবে মা, আসবে।”
এই “আসবে” শব্দটা অভিক নিজেই বিশ্বাস করে কি না, জানে না।
কিছুদিন আগে একজন ভালো মানুষ কিছু টাকা দিয়েছিলেন—অভিক ভেবেছিল, ঈদের জন্য কিছু রাখা যাবে, মেয়েদের জন্য কিছু কেনা যাবে।
কিন্তু জীবন অনেক সময় পরিকল্পনা শোনে না।
সেই টাকা সংসারের নিত্য প্রয়োজনেই শেষ হয়ে গেল।
বাইরে তখন প্রচণ্ড গরম। শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। পার্কের পাশে এসে একটু বসে অভিক। গাছের নিচে বাতাসটা যেন একটু কম নিষ্ঠুর।
চোখ ভারী হয়ে আসছিল।
মনে পড়ছিল—শেষ কবে নিজের জন্য ঈদের কাপড় কিনেছিল, ঠিক মনে নেই।
হঠাৎ বাতাস জোরে উঠল। গাছপালা কাঁপতে লাগল। তারপর বৃষ্টি।
অভিক ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরল।
মেয়েটা দরজা খুলেই দৌড়ে এল।
“আব্বু, তুমি কিছু আনো নাই?”
সে থেমে গেল।
“কটা দিন পরে আনব।”
“আবার কটা দিন?”
অভিক উত্তর দিতে পারল না।
বড় মেয়েটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কিছু বলল না। শুধু চোখ নামিয়ে নিল। সে এখন টিউশনি করছে। অভিক বুঝতে পারে, সে আর শিশু নেই, কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বড় করে ফেলেছে।
ছোট মেয়েটা আবার জিজ্ঞেস করল,
“ঈদে কি আমরা গরু দেখব?”
অভিক বলল,
“দেখব মা, ইনশাআল্লাহ।”
এই কথাটা বলার সময় নিজের কণ্ঠটা অচেনা লাগছিল।
রাত বাড়তে লাগল।
বুকের ভেতর ব্যথাটা আবার ফিরে এলো। আগের চেয়ে তীব্র।
অভিক চুপচাপ বিছানায় বসে রইল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
মেয়েরা পাশে এসে দাঁড়াল।
ওদের চোখে পানি।
ছোট মেয়েটা হঠাৎ বলল,
“আব্বু, তুমি কাঁদছো কেন?”
অভিক কিছু বলল না।
ও আবার বলল,
“ঠিক আছে। ঈদ তো শুধু একদিন না, না? সামনে আবার গরু আসবে, আবার ঈদ আসবে।”
এই একটা বাক্য—
এই সরল বিশ্বাস—
অভিকের বুকের সব ভেঙে দিল।
সে আর থামাতে পারল না।
চুপচাপ কেঁদে ফেলল।
কারণ অভিক বুঝতে পারল,
ওরা এখনো ঈদকে স্বপ্ন হিসেবে দেখে—গরু, জামা, হাসি।
আর অভিক ধীরে ধীরে শুধু বাস্তবতা হয়ে যাচ্ছে।
বাইরে কোথাও ঈদের চাঁদ উঠছিল।
অভিক জানালার দিকে তাকাল।
দূরে একটা পাতলা চাঁদ।
আর তার নিচে ছড়িয়ে থাকা শহর—যেখানে কেউ গরুর হাটে দাঁড়িয়ে দরদাম করছে, কেউ মাংস রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর কেউ নিঃশব্দে নিজের ভেতরটা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
আর অভিকের মনে হলো—কিছু মানুষ ঈদের আগেই শুধু আনন্দ থেকে না, মাংসের ঘ্রাণ থেকেও একটু একটু করে দূরে সরে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।