নীরবতার ভেতর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৫ জুন, ২০২৬
অভিকের একটা অভ্যাস ছিল। সে চুপ করে থাকত। ছোটবেলা থেকেই। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে মুখ খুলত না। আগে শুনত। তারপর ভাবত। পরে এমন এক মুহূর্তে উত্তর দিত যে সামনের মানুষটা ভাবত, এখন বলে লাভ কী?
মা প্রায়ই বিরক্ত হতেন। “তুই কি সব কথা পেটের মধ্যে রাখিস? মুখ ফুটে বলতে কী হয়?” অভিক হাসত। “সব কথা বলার মতো না, মা।” মা তখন কপাল চাপড়াতেন। “এই স্বভাবই একদিন তোর কাল হবে।” অভিক তখন বুঝত না। চুপ থাকলে ক্ষতি কী? পরে বুঝেছিল। নীরবতা সবসময় শক্তি না। কখনও কখনও সেটা মানুষের মাঝে একটা খালি জায়গা তৈরি করে। দেয়ালের মতো।
কলেজে নিশির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হলো। নিশি ছিল তার উল্টো। মনের কথা মুখে আটকাত না। ভালো লাগলে বলত। খারাপ লাগলেও বলত, সোজা।
একদিন পুরোনো আমগাছটার নিচে বসে নিশি হঠাৎ বলল, “তোমার একটা সমস্যা আছে।”
অভিক অর্থনীতির নোট থেকে মুখ তুলল। “কী?”
“তুমি সব বুঝতে চাও। কিন্তু কাউকে বুঝতে দাও না।”
“এত অভিযোগ?”
“অভিযোগ না। সমস্যা।”
“কীভাবে?”
নিশি ফাইলটা কোলের উপর রাখল। “ধরো, তোমার মন খারাপ। আমি টের পাচ্ছি। কিন্তু তুমি বলবে না। আমি কি তোমার মাথার ভেতর টর্চ মেরে দেখব?”
অভিক সেদিন কিছু বলেনি। তবে কথাটা পকেটে রেখে দিয়েছিল। পুরোনো রসিদের মতো।
বিয়ের পরও অভিক খুব একটা বদলায়নি। দায়িত্বে ফাঁকি দিত না। বাজার, বিল, নিশির মায়ের ওষুধ—সব সময়মতো করত। কিন্তু নিজের ভেতরের কথাগুলো তালা মেরে রাখত। এক রাতে অফিস থেকে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দিল। নিশি রান্নাঘর থেকে এসে দাঁড়াল। “কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
নিশি ভ্রু কুঁচকাল। “তোমার এই ‘কিছু না’ শব্দটা আমার সবচেয়ে অপছন্দের। জানো?”
“মানে?”
“মানে, বাড়িতে আগুন লাগলেও তোমার উত্তর হবে—কিছু না।”
অভিক তাকিয়ে রইল। জবাব দিল না। সেদিন রাতে দুজনেরই ঘুম হলো ছেঁড়া ছেঁড়া। পাশ ফিরলেই টের পাওয়া যাচ্ছিল।
অফিসের ঝামেলাটা হলো মাস চারেক পর। একটা বড় ক্লায়েন্টের ডেটা সাবমিশন সময়মতো যায়নি। ভেতরে ভেতরে সবাই নিজের চেয়ার বাঁচাতে ব্যস্ত।
মিটিংয়ে প্রোডাক্ট লিড রায়হান বলল, “অভিক তো ইস্যুটা আগে থেকেই জানত। ও বললে আজ এই অবস্থা হতো না।” রুমে পিনপতন নীরবতা। বস সরাসরি অভিকের দিকে তাকালেন। “তুমি কিছু বলবে?”
অভিক কয়েক সেকেন্ড চুপ। আগে হলে হয়তো চুপই থাকত। কিন্তু নিশির কথাটা কানের কাছে বাজল। মানুষকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখো না।
সে আস্তে বলল, “বলব।”
সবাই ঘুরে তাকাল।
“আমার সন্দেহ হয়েছিল। তবে কনফার্ম না হয়ে কারো নাম বলতে চাইনি।”
টেবিলের উপর তিনটা প্রিন্টআউট রাখল। লগ-টাইম, মেইল-ট্রেইল, আর ভেন্ডরের টাইমস্ট্যাম্প। “এখানে দেখলে হয়তো বোঝা যাবে কোথায় গ্যাপটা ছিল।”
বেশি কথা বলল না। যতটুকু দরকার, ততটুকুই। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, গলদটা ওর দিকে না। ভেন্ডরের সার্ভার ডাউনটাইম ছিল, যেটা কেউ ট্র্যাক করেনি।
সেদিন রাতে নিশি দরজা খুলে দিল। অভিক জুতা খুলছিল। নিশি বলল, “আজ একটা জিনিস বুঝলাম।”
“কী?”
“তোমার চুপ থাকা সবসময় খারাপ না।”
অভিক হাসল। “আগে তো উল্টো বলতে।”
“বলতাম। কারণ তখন তোমার নীরবতা আমাকে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখত।”
অভিক থামল। নিশি ধীরে বলল, “সবাইকে বাইরে রেখো না, অভিক। আমাকেও না।”
অভিক উত্তর দিল না। তবে সেদিন প্রথমবার টের পেল, চুপ থাকারও দায় আছে।
এরপর বাবার অসুখের সময় এলো। আইসিইউর সামনে দিন-রাত। অভিককে সবাই শান্ত দেখত। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ওষুধের ডোজ, আত্মীয়দের ফোন—সব সে সামলাচ্ছিল। এক মেশিনের মতো।
এক রাতে হাসপাতালের করিডোরে নিশি পাশে এসে বসল। চারপাশে ট্রলির শব্দ, নার্সদের ছুটোছুটি, কারো চাপা কান্না। নিশি ফিসফিস করে বলল, “তুমি ভয় পাচ্ছ?”
অনেকক্ষণ পর অভিক বলল, “হ্যাঁ।”
নিশি অবাক হলো। “তুমি তো বুঝতে দাও না।”
অভিক মেঝের টাইলসের দিকে তাকিয়ে বলল, “সব ভয় দেখাতে হয় না। কিছু ভয় সামলাতে হয়। নিজের সঙ্গে।”
নিশি আর কিছু বলেনি। শুধু ওর হাতটা চেপে ধরল। শক্ত করে। ওই মুহূর্তে মনে হলো, কিছু ভয় ভাগ করে নিলে হয়তো ওজন কমে।
কয়েক বছর পর। এক সন্ধ্যায় দুজন ছাদে। নিচে নিউ মার্কেটের মোড়ে জ্যাম, হর্নের শব্দ। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলছিল না। হঠাৎ নিশি বলল, “জানো, তোমার একটা জিনিস এখনও যায়নি।”
অভিক তাকাল। “কী?”
“তুমি এখনও অনেক কথা ভেতরে রাখো।”
অভিক হাসল। “তুমিও তো এখনও পাঁচটা কথা একসঙ্গে বলো।”
নিশি হেসে ফেলল। কিছুক্ষণ পর বলল, “তবে একটা ভালো হয়েছে।”
“কী?”
“আগের মতো পুরো দরজা বন্ধ করে রাখো না।”
অভিক আকাশের দিকে তাকাল। একটা প্লেনের আলো সরে যাচ্ছে। “চেষ্টা করছি।”
এরপর আর কথা হলো না। দুজন পাশাপাশি বসে রইল। নিচে শহরের আলো। তাদের মাঝখানে যে নীরবতাটা ছিল, সেটাতে এবার আর ফাঁকা লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, কিছু কথা না বললেও চলে। কারণ বলা হয়ে গেছে। অন্যভাবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।