জানালাটা খোলা থাক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত প্রায় বারোটা। রান্নাঘরের সিঙ্কে একটা প্লেট উল্টো করে রাখা। কড়াইয়ে ডাল পড়ে আছে, ওপরের দিকে সর জমে গেছে। নিশি গ্যাস বন্ধ করে বারান্দায় এসে দেখল, অভিক এখনও চেয়ারে বসে। সামনে ঝুঁকে। দুই হাতের মধ্যে ফোন। স্ক্রিনটা নিভে আছে।
‘খাবারটা গরম করে দিই?’
অভিক তাকাল না।
‘খাব না।’
‘সকালেও ঠিকমতো খাওনি।’
‘খেয়েছি।’
‘কী খেয়েছ?’
এবার অভিক তাকাল।
‘নিশি, আজ একটু থাকতে দাও।’
কথাটায় রাগ ছিল না। ছিল ক্লান্তি।
নিশি ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এক গ্লাস পানি এনে টেবিলে রাখল।
‘পানি খেয়ে নিও।’
অভিক গ্লাসটার দিকে তাকাল।
অভিকের বাবা মারা যাওয়ার পর এমন রাত কম হয়নি। প্রথম দিকে সে বাবার কথা বলত। হাসপাতালের কথা, শেষবার কী খেয়েছিলেন, কোন কথাটা বলতে চেয়েও বলতে পারেননি—সব। তারপর একসময় কথাগুলো থেমে গেল। বাবার ঘরটাও বন্ধ।
সেদিন রাতে নিশি ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোরের দিকে একটা শব্দে ঘুম ভাঙল। চাবির শব্দ। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল, অভিক বাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে। হাতে পুরোনো একটা চাবি।
নিশি উঠে এল।
‘কোথায় পেয়েছ?’
অভিক একটু চমকে তাকাল।
‘ড্রয়ারে ছিল।’
চাবিটা তালায় ঢোকাতে গিয়ে দুবার হাত কেঁপে গেল। তৃতীয়বারে তালা খুলল।
দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ন্যাপথলিনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। তার সঙ্গে বন্ধ ঘরের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। অভিক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আলমারি খুলল। একটা পাঞ্জাবি। দুটো শার্ট। ধূসর একটা সোয়েটার। নিচে টিনের বাক্স।
অভিক বাক্সটা বের করল। ভেতরে কয়েকটা কাগজ, একটা শুকিয়ে যাওয়া কলম আর একটা ঘড়ি। ঘড়িটা হাতে নিয়ে থেমে গেল সে। চামড়ার বেল্টে কালচে ঘামের দাগ এখনও আছে।
‘এটা বন্ধ?’
নিশি বলল, ‘হ্যাঁ।’
অভিক ঘড়িটা কানের কাছে ধরল। তারপর বলল, ‘এটা পরে বাবা আমার সঙ্গে শেষবার বাজারে গিয়েছিল।’
নিশি পাশে এসে বসল।
‘কী কিনেছিলে?’
অভিক একটু ভেবে বলল, ‘ইলিশ।’
‘তুমি তো ইলিশ খাও না।’
‘বাবা খেত।’
অভিকের ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি উঠল। কয়েক সেকেন্ড থাকল সেটা। তারপর যেন নিজেই টের পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল।
সেদিন সকালে প্রথমবার বাবার ঘরের জানালাটা খুলল অভিক। ধুলো জমে থাকা পাল্লা সরাতেই বাইরে থেকে আলো ঢুকে পড়ল। নিচে দুধওয়ালা সাইকেল ঠেলে যাচ্ছে। একটা রিকশার ঘণ্টা বাজল। ঘরটা হঠাৎ আর এত বন্ধ লাগল না।
নিশি রান্নাঘরে গিয়ে চা বসাল। কিছুক্ষণ পর অভিক এসে বলল, ‘দুটো চা দিও।’
নিশি তাকাল।
‘চিনি?’
‘এক চামচ।’
বাবা দুই চামচ চিনি খেতেন।
নিশি কাপ দুটো এগিয়ে দিল। অভিক চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখল।
বিকেলে অভিক ঘড়িটা নিয়ে বের হলো। ফিরল সন্ধ্যার পর। হাতে ছোট একটা পলিথিনের ব্যাগ।
নিশি ঘড়িটার দিকে তাকাল।
‘চলছে?’
অভিক ঘড়িটা হাতে পরতে পরতে বলল, ‘চলছে। তবে পাঁচ মিনিট পিছিয়ে।’
‘কেন?’
‘মিস্ত্রি বলল, ভেতরে অনেক ময়লা জমেছিল।’
নিশি হেসে বলল, ‘তাহলে পরিষ্কার করেছে।’
অভিক মাথা নাড়ল।
‘পুরো ঠিক হয়নি।’
‘থাক।’
অভিক তাকাল।
‘কী?’
‘পাঁচ মিনিট পিছিয়ে থাকলে থাকুক।’
অভিক হেসে ফেলল।
সেদিন রাতে খেতে বসে অনেকদিন পর নিজে থেকেই বাবার কথা তুলল।
‘বাবা ঘড়ি পাঁচ মিনিট এগিয়ে রাখত।’
নিশি বলল, ‘তোমারটা তো পিছিয়ে।’
অভিক নিজের হাতের দিকে তাকাল।
‘সবকিছু আগের মতো রাখতে হয় নাকি?’
নিশি ভাত মাখতে মাখতে বলল, ‘না।’
খাওয়া শেষে অভিক বাবার ঘর থেকে একটা পুরোনো চেয়ার এনে বারান্দায় রাখল।
নিশি জিজ্ঞেস করল, ‘এটা এখানে কেন?’
‘ভালো লাগে।’
অভিক বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর বলল, ‘নিশি?’
‘হুম?’
‘জানালাটা খোলা রাখব?’
নিশি বাইরে তাকাল।
‘রাখো।’
অভিক উঠে গিয়ে জানালার পাল্লাটা পুরো খুলে দিল।
বাইরে তখন গভীর রাত। দূরে একটা বাড়ির ছাদে কাপড় দুলছে। রাস্তায় একটা রিকশা ধীরে ধীরে চলে গেল।
অভিক আবার চেয়ারে এসে বসল। তার হাতে বাবার পুরোনো ঘড়ি।
টিক।
টিক।
টিক।
পাঁচ মিনিট পিছিয়ে থেকেও ঘড়িটা চলছিল।
জানালাটাও খোলা ছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।