সিঁথির পাশে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ৮ অক্টোবর ২০২৬
অনন্যা সিঁদুরের কৌটাটা খুঁজে পাচ্ছিল না।
আলমারির ওপর, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার, পুরোনো প্রসাধনীর বাক্স—সব খুলে দেখল। কোথাও নেই।
অভিক বিছানায় বসে পাঞ্জাবির বোতাম লাগাচ্ছিল।
“আমার সিঁদুরটা দেখেছ?”
অভিক মাথা তুলল না।
“আমি কি তোমার সিঁদুর নিয়ে বসে থাকি?”
“তাহলে কোথায় গেল?”
“তুমি যেখানে রাখো, সেখানেই আছে।”
“সেটাই তো খুঁজছি।”
অভিক এবার উঠে দাঁড়াল।
দুজন মিলে আবার খুঁজতে লাগল।
বত্রিশ বছরের সংসারে এমন খোঁজাখুঁজি কম হয়নি। কখনো চাবি, কখনো চশমা, কখনো ব্যাংকের কাগজ। বেশির ভাগ সময় জিনিসটা শেষ পর্যন্ত অনন্যার হাতেই পাওয়া গেছে।
অভিক আলমারির নিচের তাকে হাত ঢুকিয়ে একটা পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ বের করল।
“এটা কী?”
অনন্যা তাকিয়ে বলল,
“ওটা রেখেই দাও।”
“কেন?”
“পুরোনো জিনিস।”
অভিক ব্যাগটা খুলে ফেলল।
ভেতরে কয়েকটা চিঠি, একটা ভাঙা চশমার ফ্রেম, দুটো পুরোনো ছবি আর একটা ছোট্ট লাল কৌটা।
অভিক কৌটাটা হাতে নিয়ে বলল,
“এইটা?”
অনন্যা থেমে গেল।
“দাও।”
অভিক কৌটাটা এগিয়ে দিল।
অনন্যা ঢাকনা খুলল।
ভেতরে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া সামান্য সিঁদুর।
“এটা এখনো রেখেছ?”
“ফেলে দিতে ইচ্ছে করেনি।”
“কত বছর হলো?”
“জানি না।”
অভিক আর কিছু বলল না।
কৌটাটা হাতে নিয়েই অনন্যার হঠাৎ সেই পূজাটার কথা মনে পড়ল।
বিয়ের পর দ্বিতীয় দুর্গাপূজা।
সেদিন নতুন শাড়ি কেনা হয়নি। অনন্যা পাশের বাসার শিউলির কাছ থেকে একটা লালপাড় সাদা শাড়ি ধার করেছিল।
বিকেলে অভিক বাড়ি ফিরেছিল একটু দেরি করে।
হাতে ছিল ছোট একটা কাগজের প্যাকেট।
“তোমার জন্য।”
অনন্যা খুলে দেখেছিল কাঁচের চুড়ি। খুব সাধারণ। একটা চুড়ির গায়ে ছোট্ট একটা আঁচড়ও ছিল।
সে কিছু বলেনি।
শুধু চুড়িগুলো হাতে নিয়ে একবার উল্টেপাল্টে দেখেছিল।
অভিক বুঝেছিল।
“পছন্দ হয়নি?”
অনন্যা মাথা নাড়ল।
“হয়েছে।”
“মিথ্যা বলছ।”
“তুমি এত কিছু বুঝো কখন থেকে?”
অভিক হেসে প্যাকেটটা নিয়ে বলেছিল,
“না হলে রেখে দিই।”
অনন্যা তখন চুড়িগুলো আবার তার হাত থেকে নিয়ে বলেছিল,
“রেখে দিও না। দাও।”
সেদিন রাতে সে চুড়িগুলো পরেই ঘুমিয়েছিল।
সকালে একটা ভেঙে গিয়েছিল।
অভিক অফিসে যাওয়ার সময় দরজার পাশে পড়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়েছিল।
অনন্যা জানত।
কিছু বলেনি।
“চলো।”
অভিকের কথায় অনন্যা বর্তমানের ঘরে ফিরে এল।
“কোথায়?”
“পূজায়।”
“তুমি আগে যাও।”
“না, একসঙ্গে যাব।”
“এই বয়সেও?”
অভিক জুতো পরতে পরতে বলল,
“বয়সটা তুমি মনে করিয়ে দাও, আমি ভুলেই থাকি।”
অনন্যা আর কিছু বলল না।
মণ্ডপে তখন ভিড় বেড়েছে।
ঢাক বাজছে। ধূপের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে ফুল, ঘাম। ছোট্ট জায়গাটার মধ্যে সবাই যেন একসঙ্গে ঢুকে গেছে।
অনন্যা কয়েকজনের সঙ্গে সিঁদুর খেলায় যোগ দিল।
কেউ তার কপালে দিল, কেউ গালে।
অভিক একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
একসময় অনন্যা তাকে হাতের ইশারায় ডাকল।
অভিক এগিয়ে এল।
“কী?”
অনন্যা নিজের সিঁথির দিকে আঙুল দেখাল।
অভিক এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে পাশের থালা থেকে একটু সিঁদুর নিল।
“এখানে?”
অনন্যা মাথা নাড়ল।
অভিক আঙুলে সিঁদুর তুলে খুব সাবধানে তার সিঁথিতে দিল।
তারপর হাত সরিয়ে নিল।
কোনো ছবি তোলা হলো না।
ফেরার সময় অনন্যা হঠাৎ বলল,
“সেই চুড়িটার কথা মনে আছে?”
অভিক বলল,
“কোনটা?”
“থাক।”
অভিক একটু হেসে বলল,
“তুমি যে জিনিস মনে রাখতে বলো, সেটা আমার মনে থাকে না। আর যেগুলো ভুলে যেতে বলো, সেগুলো থেকে যায়।”
অনন্যা তাকাল না।
শুধু হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“আজকাল বেশি কথা বলো।”
“তোমার জন্যই শিখেছি।”
বাড়িতে ফিরে অনন্যা শাড়ি বদলাল।
তারপর পুরোনো কাপড়ের ব্যাগটা আবার বের করল।
শুকিয়ে যাওয়া সিঁদুরের লাল কৌটাটা ভেতরে রেখে দিল।
একটু পর নতুন কৌটাটা এনে তার পাশেই রাখল।
দুটো কৌটা পাশাপাশি পড়ে রইল।
একটায় শুকিয়ে যাওয়া বহু বছরের লাল।
অন্যটায় আজকের।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।