আবারও বৈশাখ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প । এপ্রিল ১২,২০২৬
চৈত্রের দাহ পেরিয়েই আসে বৈশাখ—এ যেন প্রকৃতির অনড় নিয়তি। অথচ আমার মতো সাধারণের উঠানে বৈশাখ আসে প্রলয়ের ঝড় হয়ে, তার রুদ্র তাণ্ডব বুকে নিয়ে।
‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ যে জীবনে, সেখানে বৈশাখের খরতাপ কেবল দেহ পোড়ায় না, স্বপ্নের শিকড়টুকুও ঝলসে দেয়।
আমার জীবনটা নিতান্তই সাধারণ, যেন বিধাতার করুণার খাতা থেকে আমার নামটাই মুছে গেছে।
সহসা মনে পড়ে যায় কাজী নজরুল ইসলামের সেই বজ্রনির্ঘোষ,
“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করিয়াছ মহান”।
কিন্তু এই উচ্চারণের সঙ্গে আমার রক্তমাংসের অভিজ্ঞতা মেলে না। বুঝে উঠতে পারি না, কবি কি দারিদ্র্যকে বিদ্রূপ করেছেন, নাকি বেদনাকে বরণ করে নিয়েছেন মহিমা দিয়ে?
আজও সেই ধাঁধার কিনারা পাইনি।
হয়তো ধনীরা দরিদ্রকে প্রবোধ দিতে, কিংবা দরিদ্র নিজেই নিজের ক্ষতে প্রলেপ দিতে, এই বাণী আওড়ায়।
আমি দারিদ্র্যকে চিরকাল ভয় পেয়েছি, উপভোগ করতে করিনি কখনো এ জীবনটাকে ।
এই কালে দারিদ্র্য আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ। দারিদ্র্য আমাকে মহান করেনি।
দারিদ্র্য আমাকে দিয়েছে আগুনের মতো ক্ষুধা, মানুষের চোখের ঘৃণা, আর অপমানের নুন।
দারিদ্র্য আমাকে করেছে অন্যের উচ্ছিষ্টে বেঁচে থাকা পরজীবী। দারিদ্র্যই আমার জিভে তুলে দিয়েছে মিথ্যার স্বাদ, হাতে ধরিয়েছে অসততার কলম।
কোন একজন বলেছিলেন, নামটি আজ স্মৃতির আড়ালে,
“দারিদ্র্য এমন এক থালা যেখানে অন্ন আছে, তৃপ্তি নেই”।
এইসব বাস্তবতার কাঁটা বিঁধে থাকে বুকের ভেতর। নিজের অজান্তেই মনের অলিগলিতে প্রশ্নেরা ভিড় করে।
“সব সাধ তো সবার মেটে না। ভাগ্য লাগে।
আচ্ছা, গরিবের ভাগ্য কি জন্ম থেকেই পোড়া? গরিবের কি স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই?
নাকি স্বপ্ন দেখাটাই তাদের জন্য পাপ?”
জানি, এই প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে। নেই আমার কাছে। নেই সেই নিষ্ঠুর দারিদ্রতার কাছেও।
টের পাই, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। কাল পহেলা বৈশাখ।
নিয়মের বৈশাখে সকাল নামবে শোভাযাত্রার ঢোল আর রঙে। পান্তা-ইলিশ হবে উৎসবের অলিখিত শপথ।
অথচ আমি? সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পরও সংসারের ন্যূনতম চাওয়াটুকু মেটাতে পারি না।
আমার দুখানা পা আজও অগণিত অচেনা পথের ক্লান্তির সাক্ষী। জীবনের এতগুলো বৈশাখ পেরিয়ে এলাম, একটিবারও উৎসবের রঙ লাগেনি গায়ে। কালের স্রোতে ভাসতে ভাসতে ঘরে এলো দুটি কন্যা।
আজ তারা কলেজে পড়ে। চোখের সামনে ডালপালা মেলেছে। সমাজের বিলাসী রীতিনীতি, উৎসবের আড়ম্বর ওরাও রোজ শিখছে।
চৈত্রের আগুনঝরা রাতে বাড়ি ফিরতেই ছোট মেয়েটা এক গ্লাস জল হাতে এগিয়ে এলো।
নরম গলায় বলল,
“বাবা, আমার জন্য বৈশাখী শাড়ি, কাচের চুড়ি আর আলতা আনবে না?
আর শোনো, ঘরে কিন্তু ইলিশ আনতে হবে।”
আমি শুধু চেয়ে থাকি। গলার কাছে শব্দেরা দলা পাকায়। বলতে পারি না কিছুই। কেবল টের পাই, চোখের কোল বেয়ে নেমে আসছে দুফোঁটা নীরব নদী।
বিকেল গড়াতেই বেরোলাম। দোকানে দোকানে ঝুলছে বৈশাখ। রঙ, আলো, ইলিশের ঘ্রাণ। সবই আছে, আমার নাগালের বাইরে।
সামান্য রোজগার আজ আমার আর আমার সন্তানের স্বপ্নের মাঝখানে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাবি, যোগ্যতা থাকলেও কেবল একটা সুপারিশের অভাবে আমার জীবনটা এমন ধুলোয় মিশে গেল।
ইলিশের পসরা সাজানো। মানুষ দরদাম না করেই তুলে নিচ্ছে রুপালি স্বপ্ন। আমি কেবল দেখলাম। দেখাটুকুই আমার জন্য বরাদ্দ।
আবার হাঁটছি। তারকা হোটেলগুলো আলোর মালায় সেজেছে। ওসব দরজার ওপাশে আমার কোনোদিন যাওয়া হয়নি। যাওয়া হয় না। পাশ ঘেঁষে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা কাচের দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে এক ঝলক হিম-শীতল হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিল আমার ঘর্মাক্ত শরীর। এক লহমায় মনে হলো, বৈশাখ বুঝি ওই শীতল ঘরেই বন্দি। আমাদের জন্য নয়।
বুকের ভেতর পুরোনো ব্যথাটা আবার মোচড় দিয়ে ওঠে। তবু হাঁটি। পা দুটো আর বইতে চায় না এই শরীরের ভার। ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয় দেখি রাত এগারোটা পেরিয়েছে। ফিরতে হবে। নিজের ঠিকানায়।
বিধ্বস্ত আমি যখন দরজা ঠেলি, ছোট মেয়েটা ছুটে আসে। আমার মুখের দিকে তাকায়। কিছু বলে না। ওর টলটলে চোখে আমি স্পষ্ট পড়ি আমারই ব্যর্থতার প্রতিবিম্ব। বৈশাখের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নটা তীরের মতো এসে বেঁধে আমার বুকে।
আর পারি না। শরীর অবশ হয়ে আসে। চোখের সামনে সব ঝাপসা। বিছানায় এলিয়ে পড়ি।
মেয়েটা কাছে এসে মাথায় হাত রাখে। ফিসফিস করে বলে,
“বাবা, আমার তো লাল-সাদা জামাটা আছেই। ওটাই কাল পরব। আর বাবা, আমার আবার অ্যালার্জি হয়েছে। আমি ইলিশ খাব না।”
ওর প্রতিটি শব্দ আমার পৃথিবীটাকে চুরমার করে দিয়ে কানের ভেতর অনুরণন তোলে।
চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। তবু শেষ শক্তিটুকু দিয়ে প্রার্থনা করি—আবারও আসুক বৈশাখ। আমার মেয়েটা পুরোনো শাড়ির পাড়েই নতুন করে সাজুক। তার হাসিটুকুই হোক আমার সব না-পাওয়ার উৎসব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।