যেখানে বই ধীরে ধীরে ঘরে ফেরে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২৫, ২০২৬
সন্ধ্যা নামার একটু আগেই কাজ শেষ করার একটা অস্থিরতা কাজ করে রফিকের ভেতর। গার্মেন্টসের হেলপার হিসেবে দিনভর কাজ শেষে শরীরটা এমনভাবে ভারী লাগে, মনে হয় ভেতরের চিন্তাগুলোও ক্লান্ত হয়ে গেছে। সেই ভার শুধু শারীরিক নাকি মানসিক ক্লান্তিরও, সেটা সে আলাদা করে নাম দিতে পারে না। তবু প্রতিদিন একই পথে ফিরে আসে সে, আর প্রায় অভ্যাসের মতোই দাঁড়িয়ে পড়ে একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে।
দোকানটা বড় কিছু না। কাঁচের শোকেসে পুরোনো বই, যেগুলোর অনেকের পাতার ধার ভাঁজ খেয়ে গেছে। দরজাটা প্রায় সবসময় আধখোলা থাকে। ভেতর থেকে কাগজ আর পুরোনো কাঠের গন্ধ মিশে এসে রাস্তার ধুলোর সঙ্গে মিশে যায়। পুরো জায়গাটায় একটা থেমে থাকা সময়।
রফিক ঢোকে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।
দোকানদার প্রথমে খুব একটা খেয়াল করেনি। কিন্তু কয়েকদিন পর একই মানুষকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ভেতরে একটা অস্বস্তি তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সে জিজ্ঞেস করে, প্রায় অনিচ্ছার মতোই—
“প্রতিদিন আসো কেন?”
রফিক একটু থামে। উত্তর দিতে সময় নেয়।
“দেখি,” সে বলে।
“কী দেখো?”
“জানি না… কিছু একটা আছে।”
এই “কিছু একটা” দোকানদারের মাথায় থেকে যায়। সে আর কিছু বলে না।
পরদিন সে একটা বই বের করে কাউন্টারের ওপর রাখে।
“নিয়ে যাও। পড়ে দেখো।”
রফিক অবাক হয়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর হাত বাড়িয়ে আবার থেমে যায়।
“টাকা লাগবে না?”
“না।”
এই সহজ ‘না’ তার কাছে অচেনা লাগে। কারণ কিছু না দিলে কিছু পাওয়া যায়—এই ধারণাটা তার জীবনে খুব পরিচিত না।
সেদিন রাতে সে বইটা খোলে।
প্রথমে ধীরে পড়ে। মাঝে মাঝে থেমে যায়। শব্দগুলো কঠিন না, কিন্তু খুব চেনাও না। মনে হয়, এই ভাষাটা সে আগে কোথাও শুনেছিল—হয়তো কোনো গল্পে, হয়তো কারও মুখে, কিন্তু তখন গুরুত্ব দেয়নি।
ঘরের আলো টিমটিম করে জ্বলছিল। বাইরে রাস্তায় মানুষ চলাচল করছে, হর্ন বাজছে, জীবন তার নিজের মতো চলছে। কিন্তু রফিক ধীরে ধীরে বইয়ের ভেতরে ঢুকে যায়। বাইরের শব্দ আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
পরদিন সে আবার দোকানে আসে।
“পড়ে দেখলাম,” সে বলে।
“কেমন লাগল?”
রফিক কাঁধ ঝাঁকায়।
“মনে হলো… গল্পটা আমার না, কিন্তু আমার আশেপাশে ঘটছে।”
এই বাক্যটা দোকানদার চুপচাপ শুনে রাখে।
দিনগুলো চলতে থাকে।
রফিক এখন প্রতিদিন বই নেয় না। সপ্তাহে একদিন নেয়। কিন্তু তার ভেতরে একটা পরিবর্তন ধরা পড়ে—সে কম কথা বলে, বেশি ভাবে, আর কখনো কখনো হঠাৎ থেমে যায় কোনো সাধারণ কথার মাঝখানে।
একদিন সে জিজ্ঞেস করে,“সবাই বই পড়ে না কেন?”
দোকানদার একটু হাসে। “সময় নেই।”
রফিক সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় না। একটু চুপ থেকে বলে,
“সময় নেই… নাকি অভ্যাসই নেই?”
দোকানদার এবার চুপ হয়ে যায়।
তার কথা বলার ধরন বদলায় না, কিন্তু চোখে একটা পুরোনো ছবি ভেসে ওঠে—তার ছেলেটা একসময় এই দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকত। বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকত, ঠিক এই রফিকের মতো। তারপর একদিন আসা বন্ধ করে দেয়। সে এই কথা কাউকে বলেনি কোনোদিন।
কিছুদিন পর শহরের এক কোণে ছোট একটা লাইব্রেরি শুরু হয়।
দোকানদারই প্রথম কথা তোলে। একদিন এক তরুণী, যে প্রায়ই পুরোনো ম্যাগাজিন কিনতে আসে, তাকে সে বলে—
“আমার গোডাউনের একটা ঘর খালি পড়ে আছে। কাজে লাগতে পারে।”
মেয়েটা ভার্সিটিতে পড়ে। তার মাথায় আগে থেকেই এমন কিছু করার ভাবনা ছিল। ছোট পরিসরে একটা পাড়া-লাইব্রেরি। বড় আয়োজন না, কিন্তু শুরুটা হতে পারে।
ঘরটা পরিষ্কার করা হয়। কিছু চেয়ারের ব্যবস্থা হয়। ধীরে ধীরে কিছু বই আসে—দোকানদারের কাছ থেকে, আশপাশের মানুষের কাছ থেকে। খুব বড় কিছু না, কিন্তু একটা জায়গা তৈরি হয়।
প্রথম দিন খুব বেশি মানুষ আসে না।
রফিক আসে।
সে দরজার সামনে একটু দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতরে তাকায়, তারপর ঢোকে। এক কোণে গিয়ে বসে পড়ে।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করে,“আগে কোথাও পড়তেন?”
“না।”
“তাহলে আজ?”
রফিক শান্তভাবে বলে,“আজ শুরু করলাম।”
এই বাক্যে কোনো নাটক নেই, তবু একটা সিদ্ধান্তের ভার আছে।
ধীরে ধীরে আরও কয়েকজন আসে। কেউ কাজ শেষে, কেউ কৌতূহল থেকে, কেউ শুধু দেখে যায়। কেউ চুপচাপ বসে থাকে, যেন নিশ্চিত হতে চায়—এই জায়গাটা তাদের জন্য কি না।
একদিন ছোট একটা আলোচনা হয়।
বিষয়—দরিদ্র মানুষের সাহিত্যচর্চা কেন কম।
কেউ বলে সময় নেই। কেউ বলে সুযোগ নেই। কেউ বলে আগ্রহ নেই। সব কথার ভেতরে কিছু সত্য থাকে, আবার কিছু অসম্পূর্ণতাও।
রফিক এবার চুপ থাকে না।
“সমস্যা শুধু একটাই না,” সে বলে। “আমরা জানতামই না, পড়াটাও একটা জায়গা হতে পারে।”
ঘরটা কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
এই চুপ থাকা অস্বস্তির না। এটা বোঝার চুপ।
এরপর থেকে লাইব্রেরিটা বদলাতে থাকে।
কেউ বই আনে, কেউ নিজের গল্প বলে, কেউ শুধু বসে থাকে। বড় কিছু ঘটে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অভ্যাস তৈরি হয়—ধীরে, প্রায় অদৃশ্যভাবে।
একদিন দোকানদারও আসে।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে।
রফিক এখন অন্যদের সঙ্গে কথা বলে, বই নিয়ে আলোচনা করে, নতুন কাউকে বই ধরিয়ে দেয়। দোকানদার কিছু বলে না।
শুধু ভাবে—বইগুলো আসলে দোকানের জন্য না। তারা কোথাও না কোথাও জায়গা খুঁজে নেয়।
রফিক একদিন আবার দোকানে আসে।
“আমি এখন লাইব্রেরিতে যাই,” সে বলে।
দোকানদার মাথা নাড়ে।
“ভালো।”
রফিক একটু থেমে বলে,
“আগে ভাবতাম এটা আমাদের জন্য না। এখন মনে হয়… শুরুটা শুধু আমাদের ছিল না।”
দোকানদার এবারও কিছু বলে না।
কারণ এই কথার ভেতরে কোনো যুক্তি নেই, তবু একটা সত্য আছে—যেটা ব্যাখ্যা করলে ছোট হয়ে যায়।
বছরের শেষে লাইব্রেরিতে ছোট একটা অনুষ্ঠান হয়।
কেউ কবিতা পড়ে, কেউ গল্প বলে।
রফিক মঞ্চে ওঠে না। পেছনে বসে থাকে।
তার পাশে একজন নতুন ছেলে ফিসফিস করে বলে,“আপনি লেখেন?”
সে একটু হাসে।“এখনো না। শুধু পড়ি।”
এই “এখনো না” এবার আর অসম্পূর্ণ মনে হয় না। বরং একটা ধীরে তৈরি হওয়া সম্ভাবনার মতো লাগে।
বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসে।
শহর আগের মতোই থাকে।
শুধু কিছু মানুষের ভেতরে বই আর দূরত্বটা আগের মতো আর একই থাকে না।
কারণ কখনো কখনো পরিবর্তন কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না।
সে আসে খুব সাধারণ একটা মুহূর্তে—কাউকে একটা বই এগিয়ে দেওয়ার ভেতর দিয়ে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।