ফেরা কি সম্ভব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প।এপ্রিল ১৭, ২০২৬
হাসপাতালের কেবিনে প্রথমে যে জিনিসটা টের পাই, সেটা নীরবতা না—গন্ধ। তীব্র ফিনাইলের গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে থাকা ওষুধের একটা ধাতব স্বাদ, যেন বাতাসও জীবাণুমুক্ত করে ফেলা হয়েছে।
বিছানার পাশে স্যালাইনের বোতল ঝুলছে। ফোঁটা ফোঁটা তরল নামছে—একটা নির্দিষ্ট ছন্দে। সেই ছন্দটাই এখন আমার সময়।
পাশের কেবিন থেকে মাঝে মাঝে কাশি শোনা যায়—খকখক, তারপর দীর্ঘশ্বাস।
কেউ বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।
আমি শুয়ে আছি। আমার শরীরটা ঠান্ডা হয়ে আছে, বিশেষ করে হাতগুলো। স্যালাইনের সুচ ঢোকানো জায়গাটা একটু টনটন করছে।
ডাক্তার আজ আর কিছু বলেনি। শুধু ফাইলটা বন্ধ করার শব্দটা অস্বাভাবিক জোরে কানে লেগেছে।
যেন কথার জায়গায় শব্দটা বসে গেছে।
আমি বুঝে গেছি—সময় খুব বেশি নেই।
তবু আশ্চর্যভাবে ভয় লাগছে না। বরং একটা প্রস্তুতি কাজ করছে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তটা আমি আগে থেকেই লিখে রেখেছিলাম কোথাও।
আমি ঠিক করেছি—আমার চলে যাওয়াটা হবে গোধূলিতে।
কারণ গোধূলি কখনও পুরো সত্য বলে না।
জানালার কাচে আলো পড়েছে। সূর্যটা নেমে যাচ্ছে। আকাশের রঙ বদলাচ্ছে—হলুদ, কমলা, তারপর ধীরে ধীরে লালচে।
এই সময়েই তুমি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠো।
আমাদের প্রথম দেখা—অস্বাভাবিক কিছু না।
তবু এখন মনে হয়, ওই মুহূর্তটাই হয়তো আমার জীবনের কেন্দ্র ছিল।
একটা ভিড়ভাট্টা বাসস্ট্যান্ড। গরমে বিরক্ত হয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি।
তুমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে বই পড়ছিলে।
পাতা ওল্টাতে গিয়ে আঙুলে হালকা করে জিভ ছুঁইয়ে নিচ্ছিলে—অদ্ভুত অভ্যাস। প্রথম দিনই সেটা দেখে আমার বিরক্ত লেগেছিল।
আমি তাকিয়ে ছিলাম।
তুমি হঠাৎ মাথা তুলে তাকালে।
আমাদের চোখাচোখি হলো।
আর আমরা দুজনেই হেসে ফেললাম।
কারণটা আজও জানি না।
তুমি অন্যরকম ছিলে—এটা বললে অর্ধেক সত্য বলা হয়।
তুমি একদিকে গভীর, অন্যদিকে অদ্ভুতরকম অগোছালো।
তোমার ব্যাগে সবসময় বই থাকত, কিন্তু মোবাইল চার্জ দিতে ভুলে যেতে।
তুমি গাছ ভালোবাসতে, কিন্তু নিজের জন্মদিন মনে রাখতে না।
একদিন বলেছিলে, “গাছেরা মানুষের চেয়ে বেশি স্থির, তাই তারা বেশি মনে রাখে।”
আমি হেসেছিলাম।
“তুমি সবকিছুকে এত সিরিয়াস করে দেখো কেন?”
তুমি একটু রেগে গিয়েছিলে।
“সবকিছু সিরিয়াস না। তুমি সিরিয়াসলি নাও না বলেই তোমার কাছে হালকা লাগে।”
সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, তুমি নিখুঁত না।
আর সেই অসম্পূর্ণতাই তোমাকে বাস্তব করেছিল।
আমাদের একটা জায়গা ছিল—একটা পুরোনো গাছের নিচে।
গাছটার ডালপালা এত ছড়ানো ছিল, যেন সে নিজেই একটা আলাদা আকাশ বানিয়ে রেখেছে।
তুমি বলেছিলে, “আমি যদি হারিয়ে যাই, এই গাছটা আমাকে মনে রাখবে।”
আমি বলেছিলাম, “আমি কি রাখব না?”
তুমি উত্তর দাওনি। শুধু মাটিতে একটা শুকনো পাতা ভেঙে ভেঙে ফেলছিলে।
সেই মচমচ শব্দটা আমি আজও শুনতে পাই।
সব শেষ হয়ে গিয়েছিল খুব সাধারণভাবে।
কোনো নাটকীয়তা ছিল না।
একদিন তুমি বললে, “আমাদের আর দেখা করা উচিত না।”
আমি হেসেছিলাম, কারণ সিরিয়াস কথা তুমি মাঝেমধ্যে বলতেই।
কিন্তু তুমি সেদিন হাসোনি।
তোমার চোখের নিচে সেদিন কালি ছিল। তিন রাত ঘুমাওনি—সেটা আমি পরে বুঝেছি।
“কেন?”
তুমি বলেছিলে, “সবকিছু সবসময় সম্ভব হয় না।”
এই একটাই বাক্য।
তার বেশি কিছু না।
সেদিন গোধূলি খুব তাড়াতাড়ি নেমে এসেছিল।
নাকি আমার ভেতরেই অন্ধকার আগে নেমেছিল—আমি জানি না।
তারপর থেকে আমি বেঁচে থেকেছি—যেভাবে মানুষ বেঁচে থাকে।
কাজ করেছি, কথা বলেছি, হাসিও করেছি।
কিন্তু ভেতরে একটা জায়গা ফাঁকা রয়ে গেছে।
আমি মাঝে মাঝে সেই গাছটার কাছে গেছি।
কিন্তু দাঁড়াইনি।
কারণ দাঁড়ালে হয়তো সত্যি কিছু ফিরে আসত—
আর আমি জানতাম, সেটা আসবে না।
“পানি লাগবে?”
নার্সের কণ্ঠে আমি বর্তমানে ফিরে আসি।
আমি মাথা নাড়ি।
গলা শুকিয়ে আছে, কিন্তু তৃষ্ণা নেই।
সে স্যালাইনের বোতলটা দেখে, একটু ঠিক করে দেয়।
তারপর পর্দা টেনে দেয়।
“সন্ধ্যা হয়ে গেছে,” সে বলে।
সে কেবিনের লাইটটা জ্বালায় না। যেন আমার গোধূলিটুকু নষ্ট না হয়।
আমি কিছু বলি না।
মনে মনে শুধু বলি—গোধূলি এখনও শেষ হয়নি।
জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে।
এক চোখে আমি আকাশ দেখি—রঙগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।
অন্য চোখে তোমাকে দেখি।
তুমি সেই গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছো।
ডালপালাগুলো নড়ছে।
হাওয়া আসছে।
তুমি এগিয়ে আসছো।
“ফিরবে?”
একটা শব্দ।
কিন্তু এর ভেতরে এতগুলো অর্থ—
ফিরে যাওয়া?
নাকি থেকে যাওয়া?
আমার ভেতরে দুই দিক থেকে টান পড়ে।
এই শহর—তার শব্দ, তার অসমাপ্ত কাজ, তার ক্লান্ত বাস্তবতা—আমাকে ধরে রাখতে চায়।
অন্যদিকে, একটা অদ্ভুত শান্তি—যেখানে কোনো শব্দ নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই।
আমি বুঝতে পারি, আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি।
শেষ মুহূর্তে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়—
ফেরা মানে হয়তো জায়গায় ফিরে যাওয়া না।
ফেরা মানে হয়তো সেই অনুভূতিতে আটকে থাকা, যেখান থেকে কখনও পুরোপুরি বের হওয়া যায়নি।
আমি তোমার দিকে তাকাই।
তুমি হাসছো।
একটু অস্থির, একটু অসম্পূর্ণ—ঠিক যেমন ছিলে।
আমি চোখ বন্ধ করি।
সূর্যের শেষ আলো মিলিয়ে যায়।
পাশের কেবিনের কাশি থেমে যায়।
স্যালাইনের ফোঁটা পড়ার শব্দটাও যেন দূরে সরে যায়।
ঘড়ির কাঁটা আছে, কিন্তু সময় নেই।
তারপর—
সবকিছু একটু থেমে থাকে।
আমি ভাবি—
ফেরা কি সত্যিই অসম্ভব,
নাকি আমরা শুধু ভুল পথে ফিরে যেতে চাই?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।