নামটা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১২ জুন, ২০২৬
সেদিন রাফি স্কুল থেকে ফিরে সোজা ঘরে যায়নি। গণিতের খাতাটা কোথায় রেখেছে সেটা মনে করতে পারছিল না। মনে হলো—হয়তো বাবার ঘরেই পড়েছিল।
বাবা তখন গোসল করছিলেন। বিছানার পাশে ফোনটা রাখা ছিল। হঠাৎ কেঁপে উঠল।
রাফি তাকাতে চায়নি। কিন্তু চোখটা চলে গেল স্ক্রিনে।
“তোমাকে খুব মিস করছি…”নামটা ছিল—মেহরিন।
সে কয়েক সেকেন্ড এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। এই নামটা কোথাও শোনা আছে কি না মনে করার চেষ্টা করল। নেই। তবু মেসেজটা অচেনা লাগল না—বরং ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠল।
সে ফোন ধরল না, খুললও না। কিন্তু ওই কয়েকটা শব্দ মাথা থেকে গেল না।
সন্ধ্যায় খেতে বসে বাবা একদম স্বাভাবিক ছিলেন। অফিসের কথা বললেন, মাকে বাজারের কথা জিজ্ঞেস করলেন। মাও স্বাভাবিক। শুধু রাফির কাছে সবকিছু একটু আলাদা লাগছিল—যেন কেউ কিছু লুকিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে।
রাতে ঘুম হলো না।
পরদিন আবার একই ঘটনা। বাবা বারান্দায় ফোনে কথা বলছিলেন। রাফি পানি নিতে গিয়ে থেমে যায়। ভেতর থেকে ভেসে আসে বাবার গলা—
“আর কয়েকদিন ধৈর্য ধরো।”
ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল।
এরপর থেকে রাফি বদলাতে শুরু করল। আগে স্কুল থেকে ফিরে মায়ের পাশে বসত, এখন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রাখে। আগে পড়ার একটা রুটিন ছিল, এখন বই খুললেও মন বসে না। ক্লাসে চুপচাপ থাকে, বন্ধুদের এড়িয়ে যায়।
একদিন সাদ বলেছিল, “তোর কী হয়েছে?
একদম বদলে গেছিস।”
রাফি শুধু হেসেছিল। কোনো উত্তর ছিল না তার কাছে।
মায়ের মুখটা দেখতে তার সবচেয়ে কষ্ট হতো। মা প্রতিদিন একইভাবে চা বানান, বাবার জামা গুছিয়ে দেন, অপেক্ষা করেন। আর রাফির ভেতরে একটা অদৃশ্য ভার জমে থাকে।
এক সন্ধ্যায় মা জিজ্ঞেস করলেন, “রাফি, কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“স্কুলে কিছু সমস্যা?”
“না।”
“তাহলে এমন চুপ কেন?”
রাফি কিছু বলল না। কথা গলায় উঠে আবার নেমে গেল। বললে সব ভেঙে যাবে কি না—এই ভয়টাই বেশি ছিল। কথা আটকে থাকল ভেতরেই।
সেই রাতে সে অনেকক্ষণ চুপচাপ কেঁদেছিল।
কয়েক সপ্তাহ পর পরীক্ষার ফল এলো। এবার নম্বর আগের মতো নেই।
মা রিপোর্ট কার্ড দেখে থমকে গেলেন। “রাফি… এটা কী?”
রাফি কিছু বলতে পারল না।
সেই রাতেই সবটা সামনে এলো।
সে পানি খেতে উঠে দেখে ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছে। মা বসে আছেন, বাবা পাশে দাঁড়িয়ে। টেবিলে ফোন। মায়ের চোখ ভেজা, বাবার মাথা নিচু।
রাফি কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। বুঝে গেল—আর কিছু লুকানো নেই।
ফিরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মা দেখে ফেললেন।
তিনজন একসাথে চুপ।
কেউ কিছু বলল না। কিন্তু সেই চুপটাই অনেক কিছু বলে দিল।
এরপর দিনগুলো সহজ ছিল না। ঝগড়া, নীরবতা, ভাঙা রাত—সব মিলিয়ে ঘরটা বদলে গেল।
আর রাফি সবচেয়ে বেশি বদলে গেল।
সে বুঝল—বড়দের ভুলের ওজন অনেক সময় ছোটদের কাঁধেই পড়ে।
একদিন বাবা এসে তার ঘরে বসলেন। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“আমি জানি তুই কষ্ট পেয়েছিস।”
রাফি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
বাবা বললেন, “কিছু ভুল এমন হয়, যেটা শুধু একজনকে না, পুরো ঘরটাকে ভেঙে দেয়। আমি সেই ভুল করেছি।”
রাফি কিছু বলল না।
ক্ষমা সহজ না। বিশ্বাসও না।
তবু সেদিন বাবার চোখে কিছু একটা সত্যি ছিল।
রাতে শুয়ে রাফি শুধু একটা জিনিস বুঝল—
একটা সম্পর্ক ভাঙলে শুধু দুজন মানুষ ভাঙে না। ভেঙে যায় একটা ঘরের ভেতরের নিরাপত্তা, একটা সন্তানের ভরসা।
আর সেই ভাঙনের শব্দ সবসময় বাইরে শোনা যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।