ফুটো টিনের নিচে আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প
১৭ জুলাই, ২০২৬
অভিকের ঘরে এখন আর আগের মতো আলো জ্বলে না। সন্ধ্যা হলে পাড়ার সব বাড়িতে ঝলমলে আলো জ্বলে, টিভি চলে, বাচ্চারা পড়তে বসে। ওর ঘরেও একটা আলো জ্বলে, তবে খুব মৃদু। পাঁচ ওয়াটের একটা ছোট বাল্ব, তারের সাথে ঝুলছে। আলোটা কাঁপে। নিশি ইচ্ছা করেই বেশি পাওয়ারের বাল্ব লাগায় না। বেশি আলোতে অভিকের ফোলা মুখ, গর্তে ঢুকে যাওয়া চোখ, ফ্যাকাসে চামড়া, সব বোঝা যায়। মৃদু আলোতে সে একটু আড়ালে থাকতে পারে। কাঁদলেও এই আলোতে কেউ সহজে বোঝে না।
ভাঙা একটা চৌকির কোণে পড়ে থাকে সে। চৌকির একটা পায়া ভাঙা, নিচে ইট দিয়ে ঠেকনা দেওয়া। একটু নড়লেই ক্যাঁচ করে শব্দ হয়। নিজের কাছেই লজ্জা লাগে।
এই মানুষটাকে দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না, একসময় সে ব্যাংকে চাকরি করত। শহরের বড় ব্যাংকের একটা শাখায়। কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকত, দারোয়ান উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিত। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, টাই, পালিশ করা জুতো। ক্যাশ কাউন্টারের পেছনে বসে টাকা গুনত। সবাই ডাকত অভিক সাহেব বলে। মাস শেষে খাম ভর্তি টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরত, নিশির হাতে দিয়ে বলত, নাও, সংসারটা সামলাও।
তখন কোনো অভাব ছিল না। মেঘকে ভালো স্কুলে দিয়েছিল। মিশির জন্মদিনে নতুন জামা আসতই।
সব শেষ হয়ে গেল এক মঙ্গলবারে। মাসের শেষ, ব্যাংকে ভীষণ চাপ। সকাল থেকে হিসাব মেলাচ্ছে। বুকের ভেতর কেমন চাপ লাগছে। পাত্তা দেয়নি। হঠাৎ বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা। যেন কেউ ভেতর থেকে হৃদয়টা দুই হাতে চেপে ধরেছে। নিশ্বাস নিতে পারছে না। চোখে অন্ধকার। হাত থেকে কলমটা পড়ে গেল। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন হাসপাতালের বিছানায়। ডাক্তার বলল, বড় হার্ট অ্যাটাক। তিনটা রক্তনালি প্রায় বন্ধ। রিং পরালে হবে না। বুক কেটে ওপেন হার্ট অপারেশন করতে হবে। খরচ চার লাখ টাকা।
ব্যাংক পনেরো দিন ছুটি দিয়ে তারপর একটা চিঠি পাঠাল। মেডিকেল বোর্ডে আপনাকে অক্ষম ঘোষণা করা হয়েছে। পঁচিশ বছরের চাকরির বিনিময়ে হাতে ধরিয়ে দিল সামান্য কিছু টাকা। এক মাসও গেল না, সব শেষ।
এখন একটু জোরে কথা বললেই বুক ধড়ফড় করে। ডাক্তার বলেছে, অপারেশন না করলে যে কোনো সময় সব শেষ হয়ে যাবে।
নিশি, তার বউ। যে মেয়েটা আগে শার্ট ইস্ত্রি করে দিত, এখন মানুষের বাড়িতে বাসন মাজে। বড় মেয়ে মেঘ, উনিশ বছর, কলেজে যাওয়ার কথা, এখন বইগুলো বস্তায় বাঁধা। ছোট মেয়ে মিশি, ক্লাস সেভেনে পড়ত, তিন মাস ধরে স্কুল বন্ধ।
টাকার চিন্তায় নিশি পাগলের মতো হয়ে গেল। তখন এলো রফিক আর জামাল। অভিকের সাথে একসাথে ব্যাংকে চাকরি করত। তারা এসে দেখল, অভিক মৃদু আলোর নিচে পড়ে আছে। রফিক বলল, ভাবি, কত লাগবে? নিশি বলল, চার লাখ। পরদিন সকাল থেকে তারা একটা পুরোনো খাতা আর একটা কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ব্যাংকের কলিগদের কাছে, বাজারের দোকানদারদের কাছে, পাড়ার মানুষের কাছে। হাত পাতল। ভিক্ষা চাইল। বলল, আমাদের বন্ধুটা মরে যাবে, ওপেন হার্ট অপারেশন না করলে বাঁচবে না।
কেউ পাঁচশো দিল, কেউ এক হাজার, কেউ মুখ ফিরিয়ে নিল। কেউ বলল, নাটক করে। রফিক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তিন দিনে দুই লাখ সত্তর হাজার টাকা উঠল। বাকি টাকা নিশি তার মায়ের দেওয়া কানের দুল বিক্রি করে, মেঘ আর মিশি তাদের মাটির ব্যাংক ভেঙে জোগাড় করল।
গত বুধবার অপারেশন হলো। বুকটা মাঝখান দিয়ে চিরে ফেলল ডাক্তাররা। করাত দিয়ে হাড় কেটে হৃদয়টা বের করে নতুন রাস্তা বানানো হলো। আট ঘণ্টা পর ডাক্তার বলল, অপারেশন ভালো হয়েছে।
বাড়ি ফিরল পনেরো দিন পর। তখন থেকে শুরু হলো আসল যন্ত্রণা। ওপেন হার্ট অপারেশনের যন্ত্রণা মুখে বলা যায় না। বুকের মাঝখানে বিশাল কাটা দাগ, গলা থেকে নাভি পর্যন্ত। ভেতরে তার দিয়ে হাড় আটকানো। একটু নড়লেই মনে হয় বুকটা ফেটে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে গেলে মনে হয় কেউ ব্লেড চালাচ্ছে। কাশি আসলে মনে হয় কলিজাটা বেরিয়ে আসবে। ডাক্তার বলেছে, বালিশ বুকে চেপে কাশতে। কাশতে গিয়ে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে। রাতে শুতে পারে না। চিৎ হয়ে একভাবে শুয়ে থাকতে হয়।
আর এই যন্ত্রণার মধ্যেই অভিক মৃত্যুকে ডাকতে শুরু করল।
গভীর রাতে, যখন ওই পাঁচ ওয়াটের বাল্বটা টিমটিম করে জ্বলে, সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন অভিক একা জেগে থাকে। বুকের সেলাইয়ের জায়গাটা দপদপ করে। তখন সে বিড়বিড় করে বলে, আমাকে নিয়ে যাও। আমি আর পারছি না। এই বুকটা, এই ঋণ, এই যন্ত্রণা, আমি আর টানতে পারছি না। আমাকে মুক্তি দাও।
সে চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করে। ভাবে, এই বুঝি নিশ্বাসটা থেমে যাবে। কিন্তু থামে না। ধক ধক শব্দটা চলতেই থাকে। আরও জোরে বাজে। মৃত্যু আসে না। মৃত্যু বড় অভিমানী। যারা তাকে বেশি ডাকে, তাদের কাছে সে সহজে আসে না।
একদিন রাতে ব্যথা খুব বাড়ল। সে নিশিকে ডাকল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, নিয়ে যাও। নিশি পাশে জেগে ছিল, শুনে ফেলল। সে কিছু বলল না। শুধু অভিকের বুকের কাটা দাগটার ওপর হাত রাখল। বলল, তুমি মরলে আমরা কী নিয়ে বাঁচব? এই দাগটা নিয়ে তো আমরা বেঁচে আছি।
অভিক বুঝল, মৃত্যু তার কাছে আসছে না, কারণ তার বুকের ওপর অনেকগুলো হাত রাখা আছে। রফিক আর জামালের হাত, যারা ভিক্ষা করে তার বুকের রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে। নিশির হাত, মেঘ আর মিশির হাত। এতগুলো হাত সরিয়ে মৃত্যুর পক্ষে তাকে ছোঁয়া সম্ভব না।
এই বুঝতে পারাটাই তার ঘুরে দাঁড়ানো। মৃত্যু কামনা করেও মৃত্যু না পাওয়াটা যে আসলে বেঁচে থাকার সুযোগ, এটা সে বুঝল।
এরপর একটা একটা করে দরজা খুলতে শুরু করল। মিশির হেড দিদিমণি বাড়িতে এসে বললেন, কাল থেকে মেয়েকে স্কুলে পাঠাও, বেতন লাগবে না। মেঘের জন্য পথ খুলল নিশির কাজের বাড়ির বউয়ের হাত ধরে। সে একটা বুটিক চালায়। বলল, আমার এখানে সেলাই শিখ। মেশিন আমি দেব। মেঘ এখন রোজ ওখানে যায়। প্রথম কামিজ বানিয়ে আটশো টাকা পেয়েছে।
আজ দেড় মাস পর। অভিক নিজে উঠে বসতে পারছে। বুকের ব্যথাটা আছে, কিন্তু আগের মতো না। রাতে এখনো সে মৃত্যুকে ডাকে, তবে অন্যভাবে। বলে, আজ না, আজ থাক। আজ মিশির পরীক্ষা। কাল এসো।
এভাবেই মৃত্যুকে কালকের জন্য রেখে দিতে দিতে সে আজ বেঁচে আছে। টিনের ফুটো দিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে তার বুকের কাটা দাগটার ওপর। মাথার ওপর সেই মৃদু আলোটা এখনো জ্বলছে। অভিক হাত দিয়ে দাগটা ছুঁয়ে দেখল। এই দাগটা তার পরাজয়ের না, এই দাগটা তার বন্ধুদের ভিক্ষা করে আনা ভালোবাসার দাগ। যে হৃদয়টা থেমে যেতে চেয়েছিল, সেই হৃদয়টাকে মানুষের ভালোবাসা আবার চালিয়ে দিয়েছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।