বিকেলের অপেক্ষা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
বৃদ্ধ মানুষটা প্রতিদিন বিকেলে গেটের সামনে বসে থাকতেন।
পাড়ার মানুষজন তাকে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কেউ ভাবত, হয়তো ছেলের ফোনের অপেক্ষা করেন। কেউ বলত, নাতি-নাতনিদের আসার আশায় বসে থাকেন।
কিন্তু আসল কথাটা কেউ জানত না। তিনি কারও জন্য অপেক্ষা করতেন না। তিনি শুধু বিকেলটা একটু ধরে রাখতে চাইতেন।
হাবিব সাহেবের বয়স এখন সত্তর পেরিয়েছে।
একসময় এই বাড়িটা অনেক ব্যস্ত ছিল। সকালে ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়ার শব্দ। রান্নাঘর থেকে রওশনের হাঁকডাক। সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে দুজনের চা খাওয়া।
ছোট একটা সংসার ছিল। কিন্তু সেই ছোট সংসারেই কেমন একটা পূর্ণতা ছিল।
এখন বাড়িটা আগের চেয়ে বড় মনে হয়। কারণ মানুষ কমে গেছে। দুই ছেলে বিদেশে থাকে। মেয়ে নিজের সংসারে। আর রওশন নেই।
পাঁচ বছর হয়ে গেছে। তারপর থেকে বাড়িটা যেন একটু চুপচাপ হয়ে গেছে।
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দিকে হাবিব সাহেব একটা পুরোনো কাঠের চেয়ার নিয়ে গেটের পাশে বসেন। চেয়ারটা অনেক পুরোনো। একপাশের হাতল একটু ভাঙা, টেপ দিয়ে পেঁচানো।
তবু তিনি বদলাননি।
পাশের বাড়ির আরিফ একদিন বলেছিল, "দাদু, নতুন একটা চেয়ার নেন না?"
হাবিব সাহেব হেসে বলেছিলেন, "এইটাই ভালো আছে।"
আরিফ তখন বুঝতে পারেনি, চেয়ারটার সঙ্গে শুধু বসার সম্পর্ক নেই।
রওশন চলে যাওয়ার পর হাবিব সাহেব অনেক কিছুই ভুলে গেছেন। কিন্তু একটা সময় ভুলতে পারেননি।
বিকেল পাঁচটা।
এই সময়টাতেই রওশন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তিনি অফিস থেকে ফিরলে রওশন চা এগিয়ে দিয়ে বলতেন, "আজ এত দেরি হলো কেন?"
হাবিব সাহেব হাসতেন। "তুমি কি ঘড়ি ধরে বসে থাকো নাকি?"
রওশন বলতেন, "না। কিন্তু তোমার ফেরার সময়টা চিনি।"
চল্লিশ বছরের সংসারে এমন অনেক ছোট ছোট কথা ছিল। যেগুলোর মূল্য মানুষ চলে যাওয়ার পর বোঝা যায়, সম্ভবত।
একদিন বিকেলে আরিফ এসে পাশে দাঁড়াল।
"দাদু, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
"করো।"
"আপনি প্রতিদিন এখানে বসে থাকেন কেন?"
হাবিব সাহেব একটু হাসলেন। "অভ্যাস।"
"কিসের অভ্যাস?"
বৃদ্ধ মানুষটা কিছুক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, "একজন মানুষ এই সময়টায় ফিরত।"
আরিফ চুপ করে থাকল। "কে?"
হাবিব সাহেব আস্তে করে বললেন, "তোমার দাদী।"
সেদিন রাতে অনেকদিন পর হাবিব সাহেব আলমারি খুললেন।
ভেতরে রওশনের কিছু শাড়ি। পুরোনো একটা চশমার বাক্স। আর কয়েকটা ছবি।
একটা ছবিতে দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। তখন চুলে পাক ধরেনি। চোখে ছিল অন্যরকম একটা উজ্জ্বলতা।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাবিব সাহেব মৃদু গলায় বললেন, "রওশন, দেখো... বাড়িটা এখনো আছে।"
একটু থেমে বললেন, "শুধু তোমার ডাকটা আর শোনা যায় না।"
পরদিন বিকেলে আরিফ আবার এল। হাতে দুই কাপ চা, মাটির ভাঁড়ে।
এক কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, "দাদু, আজ আপনার সঙ্গে বসব।"
হাবিব সাহেব অবাক হলেন। "কেন?"
আরিফ কাঁধ ঝাঁকাল। "এমনিই।"
তারপর একটু হেসে বলল, "আপনি একা বসেন তো।"
হাবিব সাহেব কিছু বললেন না। শুধু চায়ের কাপটা হাতে নিলেন।
অনেকদিন পর বিকেলটা তার কাছে এত লম্বা মনে হলো না।
এরপর থেকে আরিফ প্রায়ই আসে। কখনো দুজন গল্প করে। কখনো চুপচাপ বসে থাকে।
হাবিব সাহেব বুঝেছেন, সবসময় কথা বলার মানুষ লাগে না। কখনো কখনো পাশে বসে থাকার মানুষই যথেষ্ট।
একদিন আরিফ জিজ্ঞেস করল, "দাদু, আপনার সবচেয়ে বেশি কষ্ট কিসের?"
হাবিব সাহেব একটু ভেবে বললেন, "আগে ভাবতাম, বয়স হলে মানুষ সময় হারায়।"
তিনি একটু থামলেন। "পরে বুঝলাম, মানুষ আসলে চেনা মানুষগুলোকে হারায়।"
আরিফ কিছু বলল না।
হাবিব সাহেব গেটের বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
সেদিন বিকেলেও হাবিব সাহেব গেটের সামনে বসেছিলেন। পুরোনো চেয়ারটা ছিল। হাতে এক কাপ চা। পাশে আরিফ।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছিল। গেটটা আগের মতোই ছিল।
শুধু এবার তিনি একা বসে ছিলেন না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।