বড্ড মায়ার জগৎ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন |
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ০১,২০২৬
আগামী ২রা ফেব্রুয়ারি অভিকের ছোট মেয়ের জন্মদিন। মেয়েটি এখনো খুব ছোট, কিন্তু তার আবদারের কোনো সীমা নেই। প্রতি বছর জন্মদিনে অভিক চেষ্টা করেন—যতটা সম্ভব, কিছুটা ভালো-মন্দ রান্না করে মেয়েটিকে খুশি করতে।
কিন্তু এ বছর ভিন্ন। জীবন যেন তার সঙ্গে লড়ছে। দারিদ্র্য, অসুস্থতা আর সময়ের চাপ একসাথে আছড়ে পড়েছে। আজ অভিক প্রচণ্ড অসুস্থ; সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। তবুও হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে সে আমাকে ফোন করেছে।
ফোনটি ধরতেই তার গলায় ঝুলন্ত এক নিঃশ্বাস আমাকে স্পর্শ করল। অভিক বলল,
“বন্ধু, জানিস কি? পৃথিবী ছেড়ে যাওয়া যায়, কিন্তু বড়ো মায়া আমার দুটি মেয়ের জন্য। আমাকে ছেড়ে ওরা কি করে থাকবে, বলতো?”
আমি কিছু বলতে পারলাম না। শুধু কান দিয়ে শুনছিলাম, হৃদয় দিয়ে অনুভব করছিলাম।
“গত দুই দিন আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। আমার চিকিৎসার শেষ আশ্রয় লেজার সার্জারি। কিন্তু তুমি জানো, অসুস্থতার সঙ্গে দারিদ্র্যও লেগে আছে। ইতিমধ্যেই চিকিৎসায় লাখ লাখ টাকা খরচ করেছি। বাঁচার তাগিদে এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো কম খরচে চিকিৎসা সম্ভব হবে। কিন্তু সেখানেও অনেক ব্যয়। আমার পরিবার আর পারবে না। আত্মীয়স্বজন আজকাল ফোনও ধরছে না। তারা বলেছিল—‘তুই যা, আমরা আছি।’ আসলে কেউ নেই!”
তার শব্দে এক একাকীত্ব, যা আমাকে চুপ করে বসতে বাধ্য করল।
“আমি জানি, হয়তো আর বাঁচব না। মাস দুয়েকের মধ্যে হয়তো সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমার বউ কিছুদিন কাঁদবে। বড় মেয়েটা হয়তো পাগল হয়ে যাবে। আর ছোট মেয়েটা—আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝবে না। দু-দিন হয়তো খুঁজে বেড়াবে। রাতের বেলা কপালে চুমু না দিলে ঘুমাবে না। আমি চলে গেলে কে ওদের কান্না থামাবে? আমি না থাকলে ওরা কি করে ঘুমাবে?”
তার কণ্ঠে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং শেষ ভালোবাসার মিশ্রণ। আমি শুনছি, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না।
“এই জন্যই কষ্ট হচ্ছে। বাঁচতে খুব ইচ্ছে করছে। তুমি কি পারবে কিছু করতে?”
আমি জানি, আমার শক্তি সীমিত। হাসপাতালে আমি কিছু করতে পারি না। শুধু তার পাশে থাকা, তার কষ্ট শোনা।
অভিকের কথা চলতে থাকল।
“দিনে আমি ভুলে যেতে পারি। বন্ধুদের সঙ্গে চা খেতে যাই। কিন্তু সেখানে কেউ দরিদ্র দেখলে, কেউ ঘাড় চাপা দেয়, কেউ ক্ষমতাবান হয়ে শুধু তাকায়। কেউ সাহায্য করে না। শেষে আমি ফিরে আসি, শুধু নিজের চোখ ভিজিয়ে।”
তার এই অদম্য মায়া, নিজের মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে দুই মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বিগ্ন থাকা—সব মিলিয়ে আমার বুক চাপা হয়ে যায়। আমি কীভাবে এই বাবা-কে বাঁচাবো? হাসপাতাল তো আমার নয়, যেখানে সব কথা শুনে সমাধান করা যায়।
অভিকের জীবন দারিদ্র্য এবং অসুস্থতার চরম মিলন। হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ, ওষুধ, ল্যাব রিপোর্ট—সব মিলিয়ে মাসের উপার্জনের চেয়ে বেশি। তার চোখে একদিকে আশা, অন্যদিকে হতাশা। প্রতিটি ব্যয় তার পকেটের সীমানার বাইরে।
“আমি জানি, বাঁচার সম্ভাবনা কম, কিন্তু ছোট মেয়েটার চোখে দেখছি—আমি না থাকলে সে কি করবে?”
এই প্রশ্নের ভেতর লুকানো আছে বাবার শেষ প্রেম, শেষ দায়িত্ব এবং জীবনের মূল্য।
ছোট মেয়েটি বাবাকে ছাড়া অচেতন। রাত হলে কপালে চুমু না দিলে ঘুমায় না। বড় মেয়েটিও তার দুঃখে বিভ্রান্ত হবে। এই দুই মেয়ের জন্য বাবার চরম উদ্বেগ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি দেয় না।
বাবার কণ্ঠ শুনে বোঝা যায়, এই ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে তার সংযোগই তার জীবনের শেষ আশা।
আমি শুনছি, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। হাসপাতাল আমার নয়, অর্থ নেই, ক্ষমতা নেই। শুধু শুনে থাকা, অনুভব করা—এটাই একমাত্র সমর্থন।
অভিক বলল, “দেখিস, বললাম।” তার কথায় কোনো অভিযোগ নেই। শুধুই শেষ আহবান, শেষ ভালোবাসা।
“দিনে চা খেতে গেলে কেউ দরিদ্র দেখে ক্ষমতায় নিজেকে প্রমাণ করতে চায়। কেউ সাহায্য করে না। সবাই শুধু তাকায়।”
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ প্রায়শই ক্ষমতা ও সমাজের প্রভাব দেখিয়ে সাহায্য না করে শুধু পর্যবেক্ষক থাকে।
অভিকের জীবনের গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়। এটি মানবিক সংবেদন, বাবা-মেয়ের সম্পর্ক এবং জীবনের অসম্পূর্ণ মায়ার গল্প।
প্রতিটি কথা, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি নীরব আহবান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবিক ভালোবাসা কখনও অর্থ বা ক্ষমতার সাথে তুলনা করা যায় না।
#বড্ড_মায়ার_জগৎ #মানবিক_গল্প #পরিবার_প্রেম #দারিদ্র্য_এবং_ভালোবাসা #বাংলা_ছোটগল্প #জীবনের_মূল্য #EmotionalBanglaStories #HumanityBangla #BanglaLiterature
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।