আইসিইউতে কাটানো আমার দিনগুলোর কথা
(দ্বিতীয় খণ্ড)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
(বাস্তব ঘটনার আলোকে লেখা।)
ছোট গল্প। ২৩ মে, ২০২৬
ভেন্টিলেশনের নলটা খোলার পর গলায় আগুন জ্বলছিল। তার চেয়েও বেশি জ্বলছিল পানির তৃষ্ণা। হাতের চামচ ধরার মতো জোরও তখন আমার শরীরে ছিল না। কিছুটা হলেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম, কিন্তু এদিকে পানির জন্য জান যায় যায় অবস্থা।
ঠিক সে সময় নার্সদের উপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, “একটু পানি দিলে কী এমন ক্ষতি হবে?”
ডাক্তার রাউন্ডে এলেন। আমার বেডের পাশে এসে মনিটরের সব কিছু দেখলেন। তারপর দায়িত্বরত ডাক্তারকে বলে গেলেন, আগামী চার ঘণ্টা যেন কিছুতেই আমাকে পানি না দেওয়া হয়।
কথাটা শুনে অসহায়ের মতো শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এদিকে চেতনানাশক ওষুধের প্রভাব কমে আসছিল। ধীরে ধীরে পায়ের কাটা অংশ থেকে তীব্র ব্যথা অনুভব করতে শুরু করলাম। সেই ব্যথা আস্তে আস্তে বুকের কাটা অংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
আমার সমস্ত শরীরে তখনও তিনটি ক্যানোলা লাগানো। ক্যাথেটার তো ছিলই। পাইপগুলো যেন পুরো শরীরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল একটু কাত হয়ে শুতে পারলে হয়তো কিছুটা আরাম পেতাম, কিন্তু সেই উপায়ও নেই।
চারদিকের নিরবতা আমাকে ভয়ংকর এক মানসিক অবস্থার মধ্যে ফেলেছিল। সারাক্ষণ চেষ্টা করেও একটু ঘুমাতে পারলাম না। চোখের পাতা ভারী হয়ে এলেই শরীরের ব্যথাগুলো যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল।
তখন আন্দাজ করলাম হয়তো দুপুর হয়েছে। কারণ সে সময় দু-একজন ভিজিটরকে ভেতরে দেখলাম।
মাথাটা একটু উঁচু করে দেখলাম আমাকে ব্লাড দেওয়া হচ্ছে। সম্ভবত এ কারণেই ডাক্তার আমাকে পানি দিতে নিষেধ করেছিলেন।
এদিকে নার্স বারবার আমার গলার ক্যানোলা থেকে সিরিঞ্জে করে রক্ত নিচ্ছিল আর তার ফলাফল লগবুকে লিখে রাখছিল।
ডিউটি ডাক্তার কাছে আসলে তাকে অনুরোধ করলাম আমাকে ঘুমের একটি ইনজেকশন দিতে। তিনি বললেন, রাতে দেওয়া হবে।
কিছুক্ষণ পর খাবারের ট্রলির শব্দ পেলাম। বুঝলাম দুপুরের খাবার দেওয়ার সময় হয়েছে। আমার বেডের পাশে খাবার রেখে যাওয়া হলো।
আমার জন্য দুইজন নার্স ছিল। একজন সারাক্ষণ মনিটর পর্যবেক্ষণ করছিলেন, আরেকজন অন্যান্য কাজ করছিলেন।
একজন নার্স এসে আমার বেডের মাথার দিকটা একটু উঁচু করে দিলেন। কারণ এখন আমাকে দুপুরের খাবার দেওয়া হবে।
খাবারের মেন্যুতে ছিল নরম ভাত। কিন্তু আমার যেটা সবচেয়ে প্রয়োজন, সেই পানি কোথাও দেখলাম না।
নার্স চামচ দিয়ে অল্প অল্প করে আমার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন। কিন্তু দুই-তিন চামচের বেশি খেতে পারলাম না।
বেশ নিরবতার মধ্যেই সব চলছিল। হঠাৎ আমার পাশের বেডের রোগীর মনিটর প্রচণ্ড শব্দ করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ডাক্তার দৌড়ে সেখানে গেলেন।
দুইজন ডাক্তার তার বুকে দ্রুত চাপ দিতে শুরু করলেন। বুঝতে পারলাম সম্ভবত সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।
ডাক্তাররা তাকে কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) দিচ্ছিলেন।
না, তাতেও কাজ হচ্ছিল না। এরপর দেখলাম তাকে শক দেওয়া হলো। তারপরও রোগীর কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
এভাবে কিছুক্ষণ চেষ্টার পর হঠাৎ সব শান্ত হয়ে গেল।
অর্থাৎ রোগী না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত কাছ থেকে একজন মানুষের মৃত্যু দেখলাম, অথচ নিজের ভেতরে সামান্যতম ভয়ও কাজ করছিল না।
বরং মনে হচ্ছিল আমার শরীরের ব্যথাগুলো আরও বেড়ে যাচ্ছে। মনটা কিছুটা বিষণ্ন হয়ে উঠলো।
নিজের অজান্তেই আমি নিজের শরীরের ত্রুটিগুলো খুঁজতে শুরু করলাম।
বুঝলাম, একজন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও হাসপাতালের কাজ থেমে থাকে না। মৃতদেহসহ বেডটা বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো, তারপর আবার সব স্বাভাবিক।
মনে হচ্ছিল এখানে কিছুই হয়নি।
সেদিন প্রথমবার বুঝলাম, মানুষের জীবনের মূল্য আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী।
এভাবেই জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে কাটতে লাগলো আমার আইসিইউর প্রথম দিন।
কিছুক্ষণ পর ডিউটি ডাক্তার আমার কাছে এলেন। বললেন, “দেখেছেন, অতিরিক্ত পানি পান করলে কী ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে?”
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আসলে কী হয়েছিল, একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
ডাক্তার বললেন, অতিরিক্ত পানি পান করলে শরীরে তরলের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। অতিরিক্ত পানি শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমিয়ে দেয়, ফলে অন্যান্য ইলেক্ট্রোলাইটও পাতলা হয়ে যায়। ওই রোগীর ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল।
সদ্য অপারেশনের পর তার গ্রাফটিংয়ের উপর ভেজা ফুসফুসের প্রবল চাপ তৈরি হয়েছিল। তাকে বারবার নিষেধ করা হলেও তিনি অতিরিক্ত পানি পান করছিলেন। নার্সদের কথাও শোনেননি।
ডাক্তার আরও জানালেন, মাত্রাতিরিক্ত পানি পান করলে কিডনি অতিরিক্ত জল শরীর থেকে বের করতে পারে না।
এর ফলে বমি, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, পেটে তীক্ষ্ণ ব্যথা, বুকের ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় “হাইপোনেট্রেমিয়া” বলা হয়।
যখন কেউ অতিরিক্ত পানি পান করেন, তখন মস্তিষ্কের কোষগুলো ফুলে যেতে শুরু করে। এতে মাথার খুলির ভেতরে চাপ বেড়ে যায়।
অতিরিক্ত পানি পানের ফলে “ওয়াটার ইনটক্সিকেশন” বা পানির নেশাও হতে পারে। এতে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, কোষ ফুলে ওঠে। এর ফলে খিঁচুনি, কোমা, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে—যেটা ওই রোগীর ক্ষেত্রে ঘটেছিল।
সব কিছু শোনার পর আমার পানি খাওয়ার আগ্রহ একেবারে কমে গেল।
ধীরে ধীরে সময় এগোতে লাগলো। ডাক্তার, নার্স—সবাই তাদের ডিউটি পরিবর্তন করলেন। শুধু বেডের মাঝে পড়ে রইলাম আমরা কয়েকজন আইসিইউর রোগী।
সময়ের সঙ্গে রাত নেমে এলো। কিন্তু কোনোভাবেই ঘুম আসছিল না।
ডিউটি ডাক্তারকে আবার বললাম, “একটা ঘুমের ইনজেকশন দিন।”
তিনি নার্সকে ইশারা করলেন। দেখলাম নার্স স্যালাইনের লাইনে ইনজেকশন পুশ করলেন।
ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম, এটা হয়তো ঘুমের ওষুধ নয়। তারপরও ধীরে ধীরে চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।
আর আমি তলিয়ে গেলাম। ব্যথা, ভয়, আইসিইউ—সব কিছু কয়েক ঘণ্টার জন্য মুছে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।