বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের দেখা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
পারিবারিক ছোটগল্প
১৮ অক্টোবর ২০২৬
বাবার জানাজার পর বড় ভাই ছোট ভাইকে বলল, ‘তুই আমার কাছে মরে গেছিস।’
ছোট ভাই কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেল।
কথাটা শোনার পর আশপাশের কয়েকজন মুখ তুলে তাকিয়েছিল। কেউ কিছু বলেনি। কবরস্থানের বাইরে তখনও লোকজন দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কেউ মৃত মানুষের জন্য দোয়া করছিল। ছোট ভাই শুধু একবার পেছনে তাকিয়েছিল। বড় ভাই তখন অন্যদের সঙ্গে কথা বলছিল। তার মুখে শোক ছিল, কিন্তু ছোট ভাইয়ের দিকে তাকানোর কোনো আগ্রহ ছিল না।
তিন দিন পর বাবার ঘর খালি করতে দুই ভাই আবার একসঙ্গে দাঁড়াল।
ঘরের দরজাটা অনেক দিন ধরেই ঠিকমতো বন্ধ হতো না। বাবা বেঁচে থাকতে প্রতিবার বের হওয়ার সময় দরজাটা টেনে লাগাতেন, তারপর হাত দিয়ে ঠেলে দেখে নিতেন আটকাল কি না। সেদিনও বড় ভাই ঘরে ঢুকে দরজাটা টেনে দিল। দরজা আটকাল না। সে আর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল না।
ছোট ভাই খাটের নিচ থেকে পুরোনো কাগজের বাক্স বের করছিল। বড় ভাই আলমারির ওপরের তাক থেকে কাপড় নামাচ্ছিল। দুজনের কাজ আলাদা, অথচ ঘরের প্রতিটি জিনিস সরাতে গিয়ে বারবার একই জায়গায় হাত পড়ছিল।
বাবার ফতুয়াটা নামাতে গিয়ে বড় ভাই থেমে গেল। বুকের কাছে একটা বোতাম ছিল না। সে ফতুয়াটা ভাঁজ করে পাশে রাখল। ছোট ভাই সেটা দেখে কিছু বলল না। ফতুয়াটা সে বহুবার সেলাই করে দিয়েছে। শেষবার বোতাম লাগানোর সময় বাবা বলেছিলেন, নতুন একটা ফতুয়া কিনবেন। কেনা হয়নি।
ঘরের এক কোণে বাবার পুরোনো ছাতাটা পড়েছিল। তার হাতল ফেটে গিয়েছিল অনেক আগে। বর্ষার দিনে বাবা সেটি হাতে নিয়ে বের হতেন, ফেরার সময় ছাতার পানি বারান্দায় ঝেড়ে রাখতেন। ছোট ভাই ছাতাটা তুলে দরজার পাশে রাখল। বড় ভাই একবার তাকিয়ে আবার কাজে মন দিল।
আলমারির নিচের তাকে কাপড়ের আড়ালে কিছু একটা আটকে ছিল। টান দিতেই বেরিয়ে এল একজোড়া পুরোনো স্যান্ডেল।
স্যান্ডেলের রং প্রায় উঠে গেছে। দুই পাটির ফিতা ঢিলে হয়ে আছে। ডান পাটির তলা তুলনামূলক ঠিক থাকলেও বাঁ পাটির এক পাশ অনেক বেশি ক্ষয়ে গেছে। বাবা হাঁটার সময় বাঁ পা একটু টেনে চলতেন। সেই কারণে স্যান্ডেলের এক পাশও অন্য পাশের চেয়ে বেশি ঘষে গিয়েছিল।
বড় ভাই স্যান্ডেল দুটো হাতে তুলে নিল।
— এটা তো বাবা শেষ দিনও পরেছিল।
ছোট ভাইয়ের হাত থেমে গেল।
সেদিন বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে সে-ই স্যান্ডেল দুটো দরজার সামনে এনে রেখেছিল। বাবা বিছানা থেকে উঠে পা বাড়িয়ে স্যান্ডেল পরেছিলেন। বাঁ পাটিটা ঠিকমতো পায়ে বসছিল না। তিনি হাত দিয়ে ফিতাটা টেনে ঠিক করেছিলেন। ছোট ভাই তখন বলেছিল, নতুন একজোড়া কিনে দেবে। বাবা হেসে বলেছিলেন, ‘এখনো তো চলে।’
সেই কথার পর আর নতুন স্যান্ডেল কেনা হয়নি।
বড় ভাই স্যান্ডেল দুটো মেঝেতে পাশাপাশি রাখল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে হাত দিয়ে বাঁ পাটির ক্ষয়ে যাওয়া অংশটা ছুঁল। তারপর হাত সরিয়ে নিল।
ছোট ভাই নিজের পায়ের স্যান্ডেল খুলে বাবার স্যান্ডেলের পাশে রাখল।
বড় ভাই তার দিকে তাকাল। ছোট ভাই কিছু বলল না। নিজের স্যান্ডেল দুটোর দিকে একবার দেখে সে ঘরের মাঝখানে সরে দাঁড়াল।
বড় ভাইও নিজের স্যান্ডেল খুলে রাখল।
দুজনেই খালি পায়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের মাঝখানে বাবার ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল জোড়া। এক পাটির তলা প্রায় মসৃণ, অন্য পাটির পাশটা ঘষে সরু হয়ে গেছে।
ছোট ভাই নিচু হয়ে স্যান্ডেল দুটো পাশাপাশি মিলিয়ে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। বড় ভাইয়ের দিকে তাকাল না, বড় ভাইও কিছু বলল না।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বড় ভাই দরজাটা টেনে দিল। দরজা আগের মতোই আধখোলা রয়ে গেল।
ছোট ভাই ফিরে এসে দরজাটা ঠেলে আটকে দিল।
বাইরে মাগরিবের আজান হচ্ছিল।
বাবার স্যান্ডেল জোড়া ঘরের ভেতরেই রয়ে গেল। দুই ভাই খালি পায়ে উঠোন পেরিয়ে পাশাপাশি হাঁটল। কেউ জমির কথা তুলল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।