অপেক্ষা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১৬ জুন ২০২৬
আসরের আজান শেষ হতেই আবদুল করিম সাহেবের দিন শুরু হয়। প্রতিদিন। বৃদ্ধাশ্রমের লোহার গেটের গা ঘেঁষে সেই পুরনো প্লাস্টিকের চেয়ার। একপাশ ভেঙে পড়েছে বহুদিনের ভারে। বসলে ক্যাঁচ করে ওঠে, যেন অভিযোগ করে। আশ্রমের ছেলেরা কতবার বলেছে—“চাচা, চেয়ারটা বদলান।” তিনি হাসেন না, মাথা নাড়েন। “না। এইটাই থাক।”
বিকেল গড়ায়। সরু রাস্তাটায় জীবন বয়ে যায়। রিকশার ঘণ্টি, মোটরসাইকেলের গর্জন, স্কুল-ছুটির বাচ্চাদের কলরব। সব ছাপিয়ে তাঁর চোখ স্থির—ওই বাঁকটায়। নতুন কেউ এলে ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করে, “চাচা, কার অপেক্ষায়?” তিনি অন্যদিকে তাকান। “কারো না বাবা। এমনিই বসি।” কথাটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।
ছেলে রাকিব। সাত বছর হলো আটলান্টিকের ওপারে। প্রথমে স্বপ্ন, তারপর সংসার। এখন সেখানেই শেকড়। মাঝে মাঝে মেসেঞ্জারে ভেসে আসে নাতনির মুখ—ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়ে, চুলে লাল ক্লিপ, ক্যামেরার দিকে সরল বিস্ময়। করিম সাহেব ছবিটা বুকের কাছে ধরেন। ঠোঁট নড়ে, “হুবহু তোর ছোটবেলা, রাকিব।”
সালেহা বেগম চলে যাওয়ার পর বাড়িটা শুধু ইট-কাঠের খাঁচা। ভোরের চায়ের কাপে আর কারো ঠোঁটের ছোঁয়া নেই। রাতে জানালা বন্ধ করার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মতো কেউ নেই। একদিন রাকিব ফোনে বলেছিল, “বাবা, একা থাকা কষ্টের। এখানে ভালো হোম আছে। খরচ নিয়ে ভেবো না।” করিম সাহেব বহুক্ষণ চুপ ছিলেন। শেষে শুধু বললেন, “পাঠিয়ে দাও।” ফোন রাখার পর জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। সেই রাতেই তিনি নিজের ঠিকানা বদলে ফেললেন।
প্রতি মাসের এক তারিখে টাকা আসে। নিখুঁত সময়ে। ম্যানেজার শ্রদ্ধার গলায় বলেন, “আপনার ছেলে খুব দায়িত্বশীল মানুষ, চাচা।” করিম সাহেব শুধু মাথা কাত করেন। দায়িত্ব আর ভালোবাসা কি এক জিনিস?
জয়নাল সাহেব এলেন এক বিকেলে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। চোখে চশমা, কথায় মায়া। “রোজ বসেন যে?”
“অভ্যাস।”
“অভ্যাস, নাকি অপেক্ষা?”
করিম সাহেব হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো জোর নেই। “অপেক্ষা অভ্যাস হয়ে গেলে আর কষ্ট থাকে না, বাবা।”
ঋতু পাল্টায়। চৈত্রের খরায় চামড়া ফাটে, শ্রাবণের জলে চেয়ার ভেজে। তবু তিনি বসেন।
সেদিন ফোন বাজল। স্ক্রিনে ‘রাকিব’। রাকিবের পাশে মেয়ে রং-পেন্সিল নিয়ে ব্যস্ত। কলটা রিসিভ করতে তার কয়েক সেকেন্ড লাগল। “কেমন আছো, বাবা?”
“আছি।”
“শরীর?”
“চলে যাচ্ছে।”
দীর্ঘ নীরবতা। তারপর কম্পিত গলা, “কবে আসবি, রাকিব?”
ওপাশে কাগজ মোচড়ানোর শব্দ। “এই বছরটা… খুব চাপ, বাবা। সামনের বছর দেখি।”
“আচ্ছা।” লাইন কেটে গেল।
সন্ধ্যা নামল। জয়নাল সাহেব এসে কাঁধে হাত রাখলেন, “চলুন, ভেতরে যাই।”
করিম সাহেব উঠলেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ মেঘ করেছে। বৃষ্টি আসবে। ওর আসতে সুবিধা হবে।” বৃষ্টি এল। ছেলে এল না।
তারপর এক ভোর। বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে ব্যথা। ডাক্তার এল, ইনজেকশন দিল। রাকিবকে খবর দেওয়া হলো। রাকিব বলল, “আসছি, বাবা। কথা দিলাম।”
করিম সাহেব চোখ বুজে বললেন, “আয়। আর দেরি করিস না।”
তিন দিন পর তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। চিরকালের জন্য। কোনো অভিযোগ রাখলেন না।
আলমারির তাকে পাওয়া গেল একটা জীর্ণ খাতা। শেষ পাতায় কাঁপা হাতের লেখা—
“রাকিব,
তোর ওপর আমার রাগ নেই। তুই তোর যুদ্ধে ব্যস্ত। আমি বুঝি।
শুধু মাঝে মাঝে ইচ্ছে করত, তোর কাঁধে মাথা রেখে একটু ঘুমাই।”
রাকিব এল দুই দিন পর। ততক্ষণে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ। সে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। চেয়ারটা তখনও সেখানে। খালি। বিকেলের শেষ আলো এসে পড়েছে তার ওপর। এক কোণে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। রাস্তা দিয়ে একটা খালি রিকশা চলে গেল টুংটাং করে—যার কোনো যাত্রী নেই, কোনো গন্তব্য নেই। শুধু অপেক্ষা আছে। অনন্ত অপেক্ষা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।