শেষ হাসিটা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । মে ০১, ২০২৫
(লেখাটি সম্পূর্ণ বাস্তব কাহিনির উপর ভিত্তি করে লেখা)
আজ অনেক দিন হলো অভিকের সঙ্গে দেখা হয় না। সময় এগিয়েছে, জীবন ব্যস্ত হয়েছে, সম্পর্ক দূরে সরে যায়নি—শুধু দেখা হওয়াটাই কমে গেছে।
আজ শনিবার বলে মনে হলো, একবার দেখা করলে ভালো হয়। বিকেলের দিকে একটা মার্কেটের সামনে তাকে ডাকলাম। কিছুক্ষণ পরই অভিক এলো। মুখে সেই চিরচেনা হাসি, কিন্তু চোখের ভেতর ক্লান্তির স্তর জমে আছে। আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা বললাম, তারপর পাশের একটি ছোট হোটেলে গিয়ে চা নিলাম। ধোঁয়া ওঠা দু’কাপ চা সামনে রাখা।
কাপটা তুলতেই আমার চোখ থেমে গেল। অভিকের হাতদুটো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে আছে। আঙুলগুলো ভারী হয়ে ঝুলে আছে। মুখেও ফোলা ভাব, চোখের নিচে গভীর ক্লান্তি। মনে হলো শরীরটা নিজের ভেতরেই আটকে আছে, বাইরে শুধু একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলার আগেই অভিক চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল।
কয়েক দিন ধরে শরীর ভালো যাচ্ছে না। মাথা ভার, বুক চেপে আসে, নিঃশ্বাসে অস্বস্তি—তবু সে ডাক্তারের কাছে যায়নি, কারণ যাওয়ার সামর্থ্য অভিকের নেই। মাগরিবের নামাজ শেষে বাসায় ফিরে আসে, তারপর থেকেই অবস্থার অবনতি শুরু হয়। এর মাঝেই এক বন্ধু ফোন করে ফুড কর্নারে যেতে বলে। প্রথমে যেতে চায়নি, শরীর সাড়া দিচ্ছিল না। তবু বারবার ফোন আসায় শেষ পর্যন্ত সে যায়।
সেখানে গিয়ে দেখে আরেক বন্ধু আগে থেকেই বসে আছে। হাসি-আড্ডা, খাবারের অর্ডার, স্বাভাবিক পরিবেশ। কিছুক্ষণ পর টেবিলের পাশের আরেক টেবিলে গরম বিরিয়ানি আসে। ধোঁয়া উঠছে, ঘন হয়ে চারপাশ ঢেকে দিচ্ছে। সেই ধোঁয়ার ভেতর হঠাৎ অভিকের চোখ থেমে যায়। ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে যেন একটা মুখ তৈরি করে—তার ছোট মেয়ে পরী। ছোট্ট হাসিমাখা মুখ, অপেক্ষার চোখ।
পরী বিরিয়ানি খুব ভালোবাসে। কিন্তু শেষ কবে তাকে খাওয়ানো হয়েছে, অভিকের মনে পড়ে না। এই চিন্তাটা তার বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী হয়ে বসে যায়। শব্দগুলো দূরে সরে যায়, মানুষগুলো ঝাপসা হয়ে আসে। শুধু একটা ছবি স্পষ্ট থাকে—পরীর মুখ। সে চুপ হয়ে যায়। ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ে, কিন্তু বাইরে বোঝা যায় না। শুধু এক ফোঁটা পানি নীরবে গড়িয়ে এসে হাতের তালুতে পড়ে। সে সেটাও মুছে ফেলে, কাউকে কিছু বলে না।
এরপর আড্ডা চলতে থাকে, সময় গড়িয়ে যায়। কিন্তু অভিক সেখানে থাকে না। সে তখন অন্য কোথাও—পরীর মুখের ভেতর আটকে আছে।
রাত প্রায় ১০টা ২০। হঠাৎ মনে পড়ে বাসায় খাবার নেই। পরী হয়তো জেগে আছে। সে আর বসে থাকতে পারে না। সবাইকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যায়।
তার পকেটে কিছু টাকা ছিল। সেটা ঔষধ কেনার জন্য রাখা। ডাক্তার কড়া করে বলে দিয়েছিল—একটাও ডোজ বাদ দেওয়া যাবে না, না হলে ফুসফুসে পানি জমতে পারে। কিন্তু সেই মুহূর্তে সেই কথাগুলো দূরের কোনো শব্দের মতো হয়ে যায়। শুধু একটাই চিন্তা কাজ করে—পরী।
সে নিজের ঔষধ না কিনে সেই টাকা দিয়ে দুই প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে নেয়। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তার শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল, কিন্তু সে থামেনি।
ব্যাগ হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। রাস্তার আলো, মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ—সবকিছু ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, শুধু সামনে একটা ছোট মুখ ভাসতে থাকে।
বাসায় ফিরে দেখে পরী তখনও জেগে আছে। দরজার শব্দেই সে দৌড়ে আসে। অভিক ওর হাতে বিরিয়ানি তুলে দিতেই পরীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, বিরিয়ানি কোথায় পেলে?” অভিক একটু থামে, তারপর ক্লান্ত হাসি দিয়ে বলে, “তোর জন্য এনেছি।” পরী খুশিতে খেতে শুরু করে। ছোট মুখে তৃপ্তির আলো জ্বলে ওঠে।
অভিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভেতরে অদ্ভুত এক শান্তি কাজ করে, আবার একই সঙ্গে অজানা এক ভয়ও।
তারপর সে ধীরে ধীরে গোসল করে বের হয়। কিন্তু শরীর আর আগের মতো নেই। বিছানায় বসতেই বুকটা চাপ দিয়ে ধরছিল, শ্বাস ভারী হয়ে আসে। অক্সিমিটার দেখায় ৭০–৭৮। সে বুঝে যায় অবস্থা ভালো না। তবু চেষ্টা করে, এক হাসপাতালে যায়। কিন্তু রাত গভীর, ভিড়, বেড নেই। তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আর কোথাও যাওয়ার শক্তি থাকে না। ভোরের দিকে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে আসে।
সারারাত সে বসে থাকে। কখনো দেয়ালে হেলান দেয়, কখনো চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। টাকা নেই, সময় নেই, শরীরও নেই—শুধু একটা চিন্তা, পরী।
বাইরে ভোরের আলো ফোটে ধীরে ধীরে, কিন্তু তার ভেতরে অন্ধকার আরও ঘন হয়। সে বুঝে যায়, শরীর আর লড়াই করতে পারছে না।
অভিক বাসায় আসে। ঘর নীরব। পরী তখনও খাচ্ছে। অভিক আধশোয়া হয়ে তাকিয়ে থাকে। শ্বাস ভারী, চোখ স্থির, কিন্তু দৃষ্টি একটাই জায়গায় আটকে—পরীর মুখে। হঠাৎ পরী বলে, “বাবা, খাও না?” অভিক চুপ থাকে। তারপর খুব আস্তে বলে, “খেয়ে নে।”
পরী খেতে থাকে। অভিক তাকিয়ে থাকে। সময় যেন থেমে যায়। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে ওঠে। এই হাসি আনন্দের না, স্বস্তির না, জীবনেরও না—শুধু একটা নিঃশব্দ থেমে যাওয়ার ইঙ্গিত।
কিছুক্ষণ পর ঘরের শব্দগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, সকালের আলোটা যেন দূরে সরে যায়। আর তখনই অভিকের চোখ স্থির হয়ে যায়।
পরী তখনও খাচ্ছিল। সে কিছুই জানে না। তার ছোট্ট পৃথিবী তখন শুধু খাবার আর বাবার দেওয়া ভালোবাসায় ভরা।
কিন্তু এই ঘরের অন্য প্রান্তে একজন মানুষ তার জীবনের সব যুদ্ধ শেষ করে ফেলেছে নীরবে। আর তার মুখে রয়ে গেছে একটাই অভিব্যক্তি—
শেষ হাসিটা।
আমি সেদিন চা শেষ না করেই উঠে গিয়েছিলাম।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।