যে ঘরটা নীরব হয়ে গেল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৭ জুন, ২০২৬
একসময় এই ঘরে সন্ধ্যা হলেই হাসির শব্দ উঠত। খাওয়া শেষ করে অভিক গল্প জুড়ে দিত, কোনো কারণ ছাড়াই।
নিশি বলত, “তুমি বুড়ো হলেও এত কথাই বলবে?”
অভিক হেসে বলত, “তুমি শুনবে তো?”
নিশি উত্তর দিত না। শুধু হেসে উঠত। মায়ের থালায় তখনো ভাত পড়ে থাকত অর্ধেক।
এখন সন্ধ্যা নামে ঠিকই। আলোটা কমে আসে, মশার কয়েলের ধোঁয়া ওঠে। কথা নামে না।
অভিকের মা আট মাস ধরে বিছানায়। শুরুর দিকে ডাক্তার বলেছিলেন, সময় লাগতে পারে। সময় গেছে। অসুখটা যায়নি। চিকিৎসা চলেছে, আর ব্যাংকের স্টেটমেন্টে ঋণের অঙ্কটা বড় হয়েছে।
এর মাঝেই অভিকের চাকরিটাও চলে গেছে। প্রথম দিকে সে অনেক চেষ্টা করেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিরপুর থেকে মতিঝিল—সিভি হাতে ঘুরেছে। রাতে মায়ের পাশে বসে ওষুধ খাইয়েছে, পিঠে হাত বুলিয়েছে।
এখন আর তেমন কথা বলে না। নিশিও না। সারাদিনে তাদের যত কথা হয়, সবই দরকারি, হিসেবের।
“ওষুধটা দিয়েছ?”
“চাল আছে?”
“ডাক্তার কখন আসবেন?”
বাক্য ছোট হয়ে এসেছে। যেন শব্দ খরচ করতে ভয়।
একদিন বিকেলে লোডশেডিং হলো। ফ্যান বন্ধ। নিশি হাতপাখা দিয়ে শাশুড়িকে বাতাস করছিল। তালপাতার পাখাটায় সেলাই খুলে গেছে একপাশে।
অভিক বারান্দায় বসে ছিল। রেলিংয়ে মরচে। অনেকক্ষণ পরে নিশি এসে বলল, “চা দেব?”
অভিক মাথা নাড়ল। “থাক।”
আবার চুপচাপ। রাস্তা দিয়ে একটা রিকশা গেল, বেল বাজিয়ে।
সেই রাতে মা আস্তে করে ডাকলেন, “মা।”
“জি।”
“তোরা খুব কষ্টে আছিস, তাই না?”
নিশি তাড়াতাড়ি বলল, “এসব কেন বলছেন?”
মা একটু হাসলেন। ঠোঁটের কোণে শুকনো চামড়া। “আমাকে লুকাতে পারবি?”
নিশি মুখ ঘুরিয়ে নিল। চোখের পানি আর লুকানো গেল না। ফোঁটা পড়ল শাড়ির পাড়ে।
পরদিন সকালে আলমারি গোছাতে গিয়ে অভিক একটা পুরোনো খাম পেল। ধুলো জমেছে। ভেতরে কয়েকটা ছবি।
একটায় সে আর নিশি সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে। কক্সবাজার, হয়তো পাঁচ বছর আগের। দুজনেই হেসে আছে। নিশির চুল উড়ছে, অভিকের চোখে রোদচশমা।
অভিক ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। নিশি এসে উঁকি দিয়ে বলল, “এই ছবিটা এখনও আছে?”
অভিক মাথা নাড়ল।
তার মুখে অল্প একটা হাসি ফুটল। হতে পারে অনেক দিন পর। অথবা কয়েক মাস।
সন্ধ্যায় ওষুধ খাওয়ানোর সময় মা দুজনকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। ইনহেলারটা টেবিলে, পাশে পানির গ্লাস।
খুব আস্তে বললেন, “এভাবেই থাকিস।”
তারপর চোখ বন্ধ করলেন। নিঃশ্বাসটা আস্তে হলো। তারপর আরেকটু আস্তে।
ঘরটা আবার চুপ হয়ে গেল। তবে এবারের চুপটা অন্যরকম।
অভিক ধীরে ধীরে নিশির হাতটা ধরল। নিশির আঙুল ঠান্ডা।
নিশি হাত সরিয়ে নিল না।
জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস ঢুকছিল। নীল রঙের পর্দাটা আস্তে দুলছিল। ঘরের ভেতর কেউ কোনো কথা বলছিল না। শুধু দেয়ালঘড়িটা চলছে। টিক। টিক।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।