নীরব তৃতীয় মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১২ জুন, ২০২৬
সেদিন রাতের ভাতটা নীলিমা একটু বেশি নেড়েছিলেন। ডাল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। সামনে বসা শোভন ফোন স্ক্রল করছিল।
“তোমার অফিসের নতুন প্রজেক্টটা কী হলো?” নীলিমা জিজ্ঞেস করলেন।
শোভন চোখ তুলল না। “হুম। চলছে।”
এক শব্দ। আগে এই প্রশ্নে দশ মিনিট গল্প হতো। নীলিমা আর কিছু বললেন না। ভাতের দলাটা গলায় আটকে আছে মনে হলো।
টিভিতে খবর চলছে। পাশের ফ্ল্যাট থেকে হাঁড়ির শব্দ আসছে। সব আগের মতো। শুধু তাদের টেবিলটা কেমন ফাঁকা।
তিন মাস আগেও রাত এগারোটায় বারান্দায় দুজন চা খেত। এখন শোভন বারান্দায় যায় ঠিকই। কিন্তু একা।
নীলিমা ঘরের ভেতর থেকে দেখেন। শোভনের ঠোঁট নড়ে। হাসে। সেই হাসিটা নীলিমা চেনেন না। এটা অফিসের কলিগের সাথে হাসি না। বসের সাথেও না।
একদিন রাত দেড়টায় ঘুম ভেঙে নীলিমা দেখলেন, পাশের বালিশ খালি। বারান্দায় আলো। শোভন ফোনে টাইপ করছে। সেন্ড বাটন চাপার আগে ঠোঁটের কোণে যে ভাবটা খেলে গেল, নীলিমা তার নাম জানে না। না খুশি, না দোষী। মাঝামাঝি কিছু।
শোভন ফিরে এসে শুয়ে পড়ল। নীলিমা চোখ বন্ধ করে রাখলেন। জিজ্ঞেস করলেন না, ‘কার সাথে কথা বলছিলে?’ জিজ্ঞেস করলে যদি উত্তরটা সহ্য না হয়?
তাদের ছেলে তূর্য ক্লাস সিক্সে পড়ে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলল, “মা, বাবা কি আমার উপর রাগ?”
নীলিমা চমকে উঠলেন। “কেন বাবা?”
“আগে বাসায় এসে আমার অঙ্ক দেখত। এখন রুমে ঢুকে দরজা লাগায় দেয়।”
নীলিমা তূর্যর মাথায় হাত রাখলেন। কী উত্তর দেবেন? সত্যিটা তিনি নিজেই জানেন না।
সেই রাতে তূর্য পড়ার টেবিলে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিল। বই খোলা, কিন্তু চোখ বইয়ে নেই। নীলিমা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন। ছেলেটা কবে এত চুপ হয়ে গেল?
শুক্রবার। শোভনের ছুটি। আগে এই দিনে তিনজন ধানমন্ডি লেকে যেত। আজ শোভন বলল, “একটু কাজ আছে। বের হব।”
কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলেন না নীলিমা। জিজ্ঞেস করাটা কেমন ছোটলোকি লাগে আজকাল।
শোভন বেরিয়ে যাওয়ার পর তূর্য এসে বলল, “মা, আজ আমরা যাব না?”
নীলিমা হাসলেন। “আজ থাক বাবা। সামনের শুক্রবার যাব।”
সামনের শুক্রবার আর আসেনি।
বিষয়টা প্রথম টের পেলেন নীলিমা শোভনের জন্মদিনে।
পায়েস রেঁধেছেন। তূর্য কার্ড বানিয়েছে। রাত আটটায় শোভন মেসেজ দিল: “ফিরতে দেরি হবে। তোমরা খেয়ে নিও।”
তূর্য কার্ডটা হাতে নিয়ে বসে রইল। নীলিমা পায়েস ফ্রিজে ঢোকালেন।
রাত এগারোটায় শোভন ফিরল। হাতে বেলুন নেই, কেক নেই। চোখে একটা ক্লান্তি, যেটা অফিসের না।
তূর্য ঘুমিয়ে গেছে। কার্ডটা টেবিলে পড়ে আছে। শোভন সেটা দেখল। তুলে নিল না।
নীলিমা তাকিয়ে ছিলেন। শোভন চোখ নামিয়ে নিল। সেই মুহূর্তে নীলিমা বুঝলেন, ঘরে তারা দুজন না।
তৃতীয় একজন আছে।
তার নাম নেই। চেহারা নেই। সে শোভনের ফোনে থাকে। বারান্দার অন্ধকারে থাকে। শোভনের ওই না-খুশি, না-দোষী হাসিতে থাকে।
এরপর কথা কাটাকাটি শুরু হলো।
তুচ্ছ বিষয়ে।
“তরকারিতে লবণ বেশি কেন?”
“তুমি আজকাল সবকিছুতেই দোষ ধরো।”
“আমি ধরাই, না তুমি বদলে গেছ?”
তূর্য পাশের ঘর থেকে শোনে। দরজা চেপে ধরে। একদিন নীলিমা দেখলেন, ছেলেটা কানে হেডফোন গুঁজে রেখেছে। গান চলছে না। শুধু চিৎকারটা আটকানোর চেষ্টা।
নীলিমা সেদিন বুঝলেন, ভাঙনটা শুধু তাদের দুজনের না। তূর্যরও।
এক রাতে পানি খেতে উঠে নীলিমা দেখলেন ড্রয়িংরুমে আলো। শোভন সোফায় বসা। মাথা নিচু। সামনে ফোনটা উপুড় করে রাখা।
নীলিমা দাঁড়ালেন।
শোভন মুখ তুলল না। শুধু বলল, “আমি শেষ করতে পারছি না নীলি।”
‘কী’ জিজ্ঞেস করলেন না নীলিমা। ‘কাকে’ জিজ্ঞেস করলেন না।
শুধু বললেন, “তূর্যর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। ও ক্লাসে কারো সাথে কথা বলে না।”
শোভন এবার তাকাল। চোখ লাল।
দুজন চুপ।
পাশের ঘর থেকে তূর্যর চাপা কান্নার শব্দ ভেসে এলো। সে ভেবেছে বাবা-মা শুনবে না।
কিন্তু ঘরটা এত চুপ যে সব শোনা যায়।
নীলিমা সেদিন টের পেলেন, ভাঙার শব্দটা জোরে হয় না।
এটা হয় তূর্যর চাপা কান্নার মতো। চুপচাপ। কিন্তু একবার কানে ঢুকলে আর বের হয় না।
শোভন বাড়ি ছেড়ে যায়নি। নীলিমাও না।
তারা এখনও এক টেবিলে খায়। তূর্য স্কুলে যায়।
শুধু রাত এগারোটার বারান্দাটা এখন অন্ধকার থাকে। শোভনের ফোনটা রাতে সাইলেন্ট থাকে না, কিন্তু সে আর বারান্দায় যায় না।
তৃতীয় মানুষটা চলে গেছে কি না, নীলিমা জানেন না। জিজ্ঞেস করেন না।
তূর্য আবার অঙ্ক করতে বসে। কিন্তু অঙ্ক মেলার সময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। কী খোঁজে, কেউ জানে না।
একদিন নীলিমা তূর্যর খাতায় একটা লাইন লেখা দেখলেন। অঙ্কের নিচে। কাটাকাটি করে লেখা।
“বাবা, তুমি কি এখন ঘরে থাকো?”
নীলিমা খাতাটা বন্ধ করে দিলেন।
ঘরটা আগের মতোই আছে। একই টেবিল, একই রুটিন।
শুধু সবাই জানে, এই ঘরে তারা তিনজন না।
একজন নীরব তৃতীয় মানুষ ছিল।
সে চলে গেলেও তার ছায়াটা রয়ে গেছে। তূর্যর খাতায়, নীলিমার ঠান্ডা চায়ে, শোভনের না-দেখা চোখে।
আর সেই ছায়ার নাম কেউ দেয় না। কারণ নাম দিলেই সেটা সত্যি হয়ে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।