অদেখা যুদ্ধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
পুরো ক্লাস তাকে নিয়ে হাসছিল। কেউ জানত না, বাসায় সে কী যুদ্ধ লড়ছে।
"দেখেছিস? আবার ওই একই ব্যাগ!"
সামনের বেঞ্চ থেকে কথাটা ভেসে এল। কয়েকজন হেসে উঠল।
তিথি মাথা নিচু করে খাতা খুলল। নতুন কিছু না। ব্যাগ, ইউনিফর্ম, চুপচাপ স্বভাব, কিছু না কিছু নিয়ে মন্তব্য লেগেই থাকে।
সে উত্তর দিল না। যারা হাসতে চায়, তারা উত্তর শোনার জন্য প্রশ্ন করে না, সম্ভবত।
স্কুল ছুটির পর তিথি ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরল।
ঘরে ঢুকেই ব্যাগটা নামিয়ে রাখল। ডান পাশের ফিতেটা আবার খুলে গেছে।
মা তখনও কাজ থেকে ফেরেননি।
তিথি ড্রয়ার থেকে সুই-সুতা বের করল। প্রথমবার না। কয়েক মাস ধরেই একই ফিতা বারবার ছিঁড়ছে। নতুন ব্যাগের কথা সে মুখে আনে না। বাসার অবস্থা সে জানে।
চুপচাপ সেলাই করতে বসল।
চোখ গেল পাশের ঘরে। বাবা ঘুমিয়ে আছেন। টেবিলে ওষুধের কয়েকটা খালি পাতা, একটা ভাঁজ করা প্রেসক্রিপশন।
রাতে মা ফিরলে দুজনে হিসাব মেলাতে বসল। কোন ওষুধটা এই সপ্তাহেই লাগবে, কোনটা আরও কয়েক দিন চালানো যায়। মা খাতা বন্ধ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেললেন।
তিথি কিছু বলল না। শুধু গ্লাসে পানি ঢেলে বাবার পাশে রেখে দিল।
পরদিন বাংলা ক্লাসে দলগত কাজ। সবাই নিজেদের মতো দল বানিয়ে নিল। তিথি জানালার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
তখন পাশের বেঞ্চের মেহরাব বলল, "তুমি চাইলে আমাদের সঙ্গে বসতে পারো।"
খুব সাধারণ কথা। তবু তিথি একটু অবাক হলো। কথাটায় করুণা ছিল না। ছিল শুধু স্বাভাবিক ভদ্রতা।
কাজ শুরু হলো। অন্যরা আলোচনা করছিল। তিথি লিখছিল। কথা কম বললেও লেখালেখিটা তার ভালো লাগে।
ক্লাস শেষে সে নিজের লেখা অংশটা আলাদা করে গুছিয়ে ম্যাডামের টেবিলে জমা দিল। তারপর নিজের বেঞ্চে ফিরে গেল।
পরদিন ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকেই বললেন, "গতকালের কাজগুলো দেখেছি। একটা লেখা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে।"
ক্লাসে হালকা গুঞ্জন। ম্যাডাম খাতাটা তুলে ধরলেন।
"এটা তিথির লেখা।"
তিথি চমকে উঠল। ম্যাডাম কয়েক লাইন পড়ে শোনালেন।
রুমটা অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে গেল। যে মেয়েটা সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রে থাকে না, সবাই এখন তার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে দৃষ্টিটা আগের মতো নয়। কেউ হাসছে না।
ম্যাডাম বললেন, "ভালো লেখার সবচেয়ে বড় গুণ, সেটা মন ছুঁয়ে যায়। তিথি সেটা পেরেছে।"
তিথি কিছু বলল না। খাতার কোণায় আঙুল রাখল। বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি হলো। অনেক দিন পর নিজের সম্পর্কে ভালো কিছু শুনল।
টিফিনে মেহরাব এসে বলল, "তুমি এত সুন্দর লিখতে পারো, আগে জানতাম না।"
তিথি হালকা হাসল। "আমি কাউকে বলিনি।"
"সব কথা বলতেও হয় না," মেহরাব বলল।
সেদিন বাসায় ফিরে তিথি আবার বাবার ওষুধের হিসাব মেলাতে বসল। ব্যাগের সেলাই করা ফিতেটাও আগের মতোই আছে। ঘরের সমস্যাগুলো কোথাও যায়নি।
তবু মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা শুধু হাসাহাসির জায়গা না। এখানে কিছু মানুষ আছে, যারা দেখতেও জানে।
পরদিন সকালে স্কুল গেটের সামনে এসে তিথি একবার থামল। কাঁধে সেই পুরোনো ব্যাগ। ফিতার সেলাই এখনও স্পষ্ট।
কয়েকজন পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। কেউ তাকাল। কেউ হয়তো চিনলও।
তিথি গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল।
আজও তার জীবন বদলে যায়নি। একটা জিনিস বদলেছে।
আজ সে মাথা নিচু করে হাঁটল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।