শেষ মজুরির দিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০১,২০২৬
মে মাসের প্রথম সকাল। শহরজুড়ে লাল পতাকা, মাইকে স্লোগান—“শ্রমিকের অধিকার চাই”—সবই যেন ঠিকঠাক আছে। তবুও কোথাও একটা অস্বস্তি রয়ে যায়; বাইরে থেকে দিনটা আলাদা লাগে, ভেতর থেকে ততটা নয়—বিশেষ করে তাদের জন্য, যাদের প্রতিদিনের শুরুই হয় হিসাব কষে।
অভিক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকায়, তারপর দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। শার্টটা টেনে ঠিক করে—এটা কাপড় ঠিক করা না, নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
পেছন থেকে নিশির গলা ভেসে আসে, ক্লান্ত কিন্তু চেপে রাখা—“আজ তো মে দিবস, আজও যাবে?”
অভিক একটু থামে, যেন উত্তরটা বেছে নিচ্ছে। তারপর হালকা হাসে—“মে দিবস বলেই তো যেতে হয়।”
নিশি আর কিছু বলে না। টিফিনটা বাড়িয়ে দেয়—ভাত, ডাল, অল্প ভাজি। এই সামান্য জিনিসটাই এখন তাদের টিকে থাকার যুক্তি।
ভেতর থেকে নীলা আর নীলম বের হয়ে আসে। দু’জনেই ভার্সিটিতে পড়ে, তাই তারা জানে—অথবা অন্তত মনে করে জানে। আজকের দিনটা তাদের কাছে ছুটি না, বরং একটা প্রশ্নের জায়গা।
নীলা বলে, “আজ তাড়াতাড়ি আসবা?”
অভিক উত্তর দেয়, “চেষ্টা করব।”
কথাটা বলেই সে জানে, এই ‘চেষ্টা’ অনেক সময় কোনো প্রতিশ্রুতি না—শুধু এড়িয়ে যাওয়া।
নীলম চুপ করে ছিল। তারপর বলে, “মে দিবস আসলে কী?”
অভিক একটু ভেবে নেয়—“যারা কাজ করে, তাদের জন্য একটা দিন… সম্মানের।”
নীলম তাকিয়ে থাকে। “তাহলে আজও তোমাকে যেতে হচ্ছে কেন?”
প্রশ্নটা সরাসরি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
অভিক ধীরে বলে, “সম্মান থাকলেই পেট ভরে না।”
নিশি মুখ নামিয়ে নেয়। কথাটা নতুন না, তবুও প্রতিবার শোনার সময় ভেতরে কোথাও লাগে।
কারখানার সামনে আজ ভিড় বেশি। লাল ব্যানার, স্লোগান, উত্তেজনার ভেতরে এক ধরনের তাড়াহুড়া। রাশেদ এসে দাঁড়ায়, চোখে আগের মতোই আগুন—“চল, আজ মিছিলে যাই। আজ তো আমাদের দিন।”
অভিক তাকায়, কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে জিজ্ঞেস করে, “মিছিলে গেলে আজকের মজুরি পাবো?”
একটা ছোট প্রশ্ন। কিন্তু অস্বস্তিকরভাবে সঠিক জায়গায় আঘাত করে।
রাশেদ থেমে যায়। কিছু বলতে চায়, পারে না। তারপর ভিড়ের দিকে হাঁটে।
অভিক ঢুকে পড়ে ভেতরে—মেশিনের শব্দে, নিয়মিত ক্লান্তির ভেতরে।
দিনটা ধীরে ধীরে শরীরকে ভেঙে দেয়। মেশিনের তাপ, ধাতব শব্দ, ঘামের গন্ধ—সব মিলিয়ে মানুষটা যেন কাজের অংশ হয়ে যায়। বাইরে থেকে স্লোগান ভেসে আসে, কিন্তু ভেতরে তার কোনো প্রতিধ্বনি তৈরি হয় না।
একসময় অভিক থামে। খুব অল্প সময়ের জন্য। তার মনে পড়ে—সে-ও একসময় এই স্লোগান দেয়। তখন মনে হতো, লড়াই মানেই পরিবর্তন। এখন সে জানে, অনেক সময় লড়াই মানে শুধু টিকে থাকা।
হঠাৎ একটা চিৎকার সবকিছু থামিয়ে দেয়। পাশের মেশিনে কাজ করা লোকটার হাত কেটে যায়। রক্ত ছড়িয়ে পড়ে, চারপাশে হুড়োহুড়ি। কেউ পানি আনে, কেউ কাপড় চেপে ধরে।
অভিক এগিয়ে যায়, কিন্তু গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ সে জানে—এই দৃশ্য নতুন না, বরং খুব পরিচিত।
কেউ বলে, “হাসপাতালে নিতে হবে!”
আরেকজন নিচু গলায় বলে, “মালিক কিছু দেবে কি না… বলা যায় না।”
মুশকিল।
শব্দটা মাথায় আটকে থাকে।
অভিক তাকিয়ে থাকে। কয়েক ঘণ্টা আগেও মানুষটা স্বাভাবিক ছিল। এখন তার চোখে শুধু ভয়।
আজ মে দিবস—এই হিসাবটা মিলছে না। আবার, অদ্ভুতভাবে, খুব ভালোই মিলে যাচ্ছে।
রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়। নিশি দরজায় দাঁড়িয়ে, চোখে অস্বস্তি। অভিক ঘটনাটা বলে—খুব বেশি না, আবার কমও না।
নীলা চুপ করে শোনে। তারপর বলে, “বইয়ে তো অন্যরকম লেখা, বাবা।”
নীলম ধীরে বলে, “তাহলে এগুলো আসলে কী?”
অভিক বসে পড়ে। “পুরো গল্পটা হয়তো এখনো শেষ হয় নাই।”
নীলম থামে না—“তাহলে এগোয় না কেন?”
নিশি বলে, “হয়তো আমরা চুপ থাকি।”
অভিক মাথা তোলে।
“সবাই চুপ থাকে না ইচ্ছা করে। অনেক সময় উপায় থাকে না। যে আজ যায় নাই, সে হয়তো ভুল করে নাই—সে শুধু বাসায় ফিরতে চায়।”
ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে যায়। এই নীরবতার ভেতরেই কথাগুলো সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।
রাত গভীর হয়। শহর চুপ। অভিকের মাথা ঠান্ডা না। জানালার পাশে বসে সে দিনের সবকিছু একসাথে ভাবার চেষ্টা করে—মিছিল, রক্ত, মেয়েদের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে একটা চাপ তৈরি হয়।
নীলা এসে পাশে দাঁড়ায়। “আমরা শুধু পড়লেই হবে না মনে হয়।”
নীলম বলে, “বোঝা লাগে… মনে হয়।”
অভিক তাকিয়ে থাকে। কিছু বলে না। তবুও বোঝা যায়—তার ভেতরে কিছু একটা নড়েছে।
পরের দিন সকাল সব আগের মতোই।
তবুও পুরোপুরি না।
দরজার কাছে এসে অভিক বলে, “আজ একটু দেরি হইতে পারে।”
নিশি শুধু তাকায়। জিজ্ঞেস করে না।
নীলা আর নীলম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে—চুপচাপ, কিন্তু আগের মতো না।
অভিক বের হয়ে যায়।
কাজে যাচ্ছে—এইটা ঠিক।
কিন্তু শুধু কাজেই?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।