নীলের চেয়ার
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২০ জুন, ২০২৬
আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে অভিকের মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটা যেন শহরের অন্য সব জায়গা থেকে আলাদা।
একই রাস্তায় মানুষ যাচ্ছে, রিকশা চলছে, পাশের চায়ের দোকানে ভিড়। কেউ হাসছে, কেউ ফোনে কথা বলছে। সবকিছু স্বাভাবিক।
শুধু নিশিদের জন্য আজকের দিনটা স্বাভাবিক নয়।
আজ রায় হবে।
দুই বছর ধরে যে দিনের অপেক্ষা করেছে নিশি, আজ সেই দিন।
অভিক ভিড়ের মধ্যে একবার চারপাশে তাকাল। তারপর চোখ আটকে গেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিশির দিকে।
সাদা সালোয়ার-কামিজ পরা নিশি বারবার নিজের ব্যাগের চেইন খুলছে, আবার বন্ধ করছে। সকাল থেকে সে এই কাজটাই করছে।
অভিক কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
—"কিছু খেয়েছ?"
নিশি মাথা নাড়ল।
—"না।"
—"কেন?"
—"ইচ্ছা করেনি।"
অভিক আর কিছু বলল না।
দুই বছর আগে নীলও এমনই একটা সাধারণ বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল।
নিশির ছোট ভাই। সবসময় হাসিখুশি একটা ছেলে। অভিকের সঙ্গে দেখা হলেই বলত, "ভাইয়া, একদিন আপনার সঙ্গে বাইকে ঘুরতে যাব।"
সেই ঘুরতে যাওয়া আর হয়নি।
সেদিন নীল বের হয়েছিল একটা ছোট কাজের জন্য। তারপর আর বাড়ি ফেরেনি।
অভিকের সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ত ডাইনিং টেবিলের ডান পাশের চেয়ারটা।
নীলের চেয়ার।
ওটা এখনো সেখানেই আছে।
প্রথম দিকে নীলের মা খাবার দিতে গিয়ে ভুল করে ওই চেয়ারটার দিকেও তাকাতেন। তারপর থেমে যেতেন।
এখন আর তাকান না।
কিন্তু ওটা সরানো হয়নি।
আদালতের দরজা খুলে গেল।
মানুষজন ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।
নিশি কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
অভিক বলল,
—"চলো।"
ভেতরে যাওয়ার সময় নিশি হঠাৎ বলল,
—"অভিক।"
—"হুম?"
—"আজ যদি ওদের শাস্তি হয়..."
সে থেমে গেল।
অভিক তাকাল।
—"তাহলে কি সত্যিই ভালো লাগবে?"
অভিক একটু সময় নিল।
—"জানি না।"
নিশি তার দিকে তাকাল।
অভিক আস্তে করে বলল,
—"তবে এতদিন যে প্রশ্নটার উত্তর খুঁজেছ, অন্তত তার একটা উত্তর পাওয়া যাবে।"
নিশি কিছু বলল না।
তার চোখ চলে গেল আদালতের দরজার দিকে।
—"কিন্তু নীল তো এটা দেখবে না।"
এজলাসে বিচারক এলেন।
চারপাশ শান্ত হয়ে গেল।
রায় পড়া শুরু হলো।
অভিক নিশির দিকে তাকিয়ে ছিল।
নিশি একদম সামনে তাকিয়ে বসে আছে। শুধু তার হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আছে।
রায়ের প্রতিটি শব্দ যেন সে ধরে ধরে শুনছিল।
অবশেষে অভিযুক্তদের শাস্তি ঘোষণা হলো।
আদালতের ভেতর চাপা একটা শব্দ উঠল।
কেউ চোখ মুছল।
কেউ মাথা নিচু করল।
কেউ বাইরে ফোন করে খবর দিল।
নিশি বসেই রইল।
অভিক আস্তে করে বলল,
—"নিশি..."
সে ধীরে মাথা তুলল।
—"জানো, আমি ভেবেছিলাম আজ হয়তো একটু হালকা লাগবে।"
একটু থেমে বলল,
—"কিন্তু বাসায় গিয়ে ওই চেয়ারটা দেখলে কী হবে?"
অভিক নিশির দিকে তাকিয়ে রইল।
আদালতের বাইরে বের হওয়ার পর কয়েকজন সাংবাদিক এগিয়ে এল।
"আপনার অনুভূতি কী?"
"আপনি কি ন্যায়বিচার পেয়েছেন?"
নিশি কারও দিকে তাকাল না।
অভিক তাকে নিয়ে ভিড় থেকে একটু দূরে চলে গেল।
রাস্তার পাশে ছোট একটা ফুচকার দোকান ছিল।
হঠাৎ অভিক বলল,
—"নীল থাকলে এখন কী করত?"
নিশি একটু অবাক হলো।
তারপর অনেকদিন পর তার মুখে সামান্য হাসি দেখা গেল।
—"ফুচকা খেত।"
—"তাহলে খাওয়া যাক।"
নিশি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল,
—"ভাই, ঝাল একটু বেশি দিয়েন।"
প্রথম ফুচকাটা মুখে দেওয়ার পরই তার চোখ ভিজে উঠল।
নিশি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
—"আমি ভয় পাচ্ছিলাম, নীলকে হারানোর পর ওর কথা মনে হলেই শুধু ওই দিনটার কথাই মনে পড়বে।"
একটু থেমে আবার বলল,
—"কিন্তু ও তো শুধু ওই দিনের মানুষ না।"
অভিক শুনছিল।
—"ও মাকে বিরক্ত করত। আমার সঙ্গে ঝগড়া করত। চকলেট চাইত। এসবও তো মনে রাখতে হবে।"
অভিক মাথা নেড়ে বলল,
—"হ্যাঁ।"
সন্ধ্যা তখন নেমে গেছে।
দোকানের সামনে বাতি জ্বলেছে।
দুজন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
বাড়ির কাছে এসে নিশি থেমে গেল।
ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল।
নীলের হাতের লেখা।
অনেকদিন ধরে সঙ্গে রেখেছে।
সে কিছুক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার ভাঁজ করে ব্যাগে রেখে দিল।
অভিক কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সামনের রাস্তায় আলো জ্বলছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।