বৃষ্টি ভেজা কাঁধে সন্তানের স্বপ্ন
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫
নিম্নচাপের কালো মেঘে ঢেকে গেছে সারা আকাশ। অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি—চারিদিকে কেবলই সেই রিনিঝিনি শব্দ, যেন কেউ অবিরাম কাঁদছে। অভিক আনমনে শুয়ে আছে তার টিনের চালের নীচে। বৃষ্টির টোকা তার বুকে লাগছে, যেন জীবনের প্রতিটি আঘাতের স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে।
অভিকের জীবন এখন এক কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র। হার্টের রোগে আক্রান্ত হয়ে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। অপারেশনের খরচ আর সইতে পারেনি তার শরীর, না তার সংসার। বেকারত্ব এসেছে যেন এক নির্মম ঝড় হয়ে—সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। সকালে উঠে গোসল করে নাস্তার টেবিলে বসতেই মনে পড়ে, চাকরিটা তো আর নেই। বুকের ব্যথা তখন আরও চেপে বসে।
তবু সংসারের চাকা থামে না। ছোট মেয়ে পরি—সেই শান্ত, মিষ্টি মেয়েটি—পড়াশোনায় সবসময় প্রথম। ক্লাসে কখনো দ্বিতীয় হয়নি। এবার ইন্টার পরীক্ষা শেষ করেছে, কিন্তু টাকার অভাবে তার স্বপ্ন থেমে যাওয়ার মুখে। ভার্সিটিতে ভর্তির সামর্থ্য অভিকের নেই। পরির চোখ দুটো লাল, নীচে ফুলে গেছে। কথা বলে কম, কিন্তু সেই ভেজা চোখে যেন হাজার কথা—যা অভিকের রক্ত হিম করে দেয়।
বন্ধুদের কাছে সাহায্য চেয়েছে অভিক। কেউ কেউ বলেছে, “সবার মেয়ে তো আর পড়তে পারে না।” কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধেছে বুকে।
অসুস্থ শরীর নিয়ে অভিক এখন নির্মাণস্থলে শ্রমিকের কাজ করে—কারণ এ ছাড়া নগদ টাকা আয়ের আর কোনো পথ খোলা ছিল না তার সামনে। কলমের হাতে ধরেছে ভারী ইট-সিমেন্টের বস্তা। প্রথম প্রথম পিঠে বস্তা তুলতেই বুকটা চিনচিন করে উঠত, হাঁপিয়ে উঠত শ্বাস। রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হতো শরীর নীল হয়ে গেছে ব্যথায়—পিঠ, কোমর, হাত—সব যেন ভেঙে পড়ছে। তবু ভোরে উঠে আবার বেরিয়ে পড়ে। হার্টের ব্যথা চেপে রেখে ভারী বোঝা কাঁধে তুলে নেয়—কারণ থামলে সংসার থেমে যাবে।
আজ বৃষ্টি আরও প্রবল। মাথায় বৃষ্টি নিয়ে সাইটে গেল অভিক। কাদা-পানিতে ভারী বোঝা টেনে নিয়ে যেতে লাগল। শরীর ভিজে গেল, ঘামের সাথে মিশে গেল বৃষ্টির ধারা। বুকের ব্যথা যেন ছুরি হয়ে বিঁধছে, শ্বাস আটকে আসছে, কিন্তু থামার সময় নেই—আজ পরির ভর্তির টাকা জোগাড় করতে হবে। একের পর এক বোঝা কাঁধে তুলে ছুটে চলেছে সে। বিকেলে কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরল। শরীর থরথর করে কাঁপছে।
রাতে পরির মুখ দেখছে অভিক। মেয়েটি বলল আবেগভরা গলায়, “বাবা, তুমি সুস্থ হও। চাকরি করো। তারপর আবার পড়াশোনা করা যাবে।” কথাগুলো যেন শান্ত সাগরে ঢেউ তুলল। অভিক শান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে মামনি, আমি তোমার পড়ার ব্যবস্থা করব।”
বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়ল অভিক। পরদিন ফজরের আজানে ঘুম ভাঙল, তবু বৃষ্টি থামেনি। আবার বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু শরীর আর সইল না। বাড়ি ফিরে অচেতন হয়ে পড়ল। ফোন পেয়ে ছুটে গেলাম। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। স্টিলের ট্রলিতে শুয়ে আছে অভিক—নিশ্চুপ, স্থির। আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হল। কাচের দেয়ালের ওপাশ থেকে দেখছি ডাক্তারদের নিরলস চেষ্টা...
আজও বৃষ্টির সময় সবাই সৌন্দর্য দেখে, আমি শুনি অভিকের বুকের কান্না। আর কানে ভেসে আসে সেই বিড়বিড়ানি—তার শেষ কথাগুলো, যেন জীবনের শপথ:
“বাবারা কখনো দুর্বল হয় না—তাদের রক্তে জ্বলে অটুট ইস্পাতের আগুন।
বাবারা কখনো দরিদ্র হয় না—তাদের হাতে থাকে সংসারের চাকা ঘোরানোর অমোঘ শক্তি, যা টাকার চেয়ে অনেক বড়।
বাবারা কখনো হারে না—ঝড়ে ভেঙে পড়লেও তারা আবার দাঁড়ায়, কারণ তাদের পিঠে চেপে আছে সন্তানের স্বপ্নের ভার।
বাবারা কখনো হার মানতে শেখেনি—তাদের বুকের ভেতর জ্বলছে এক অদম্য জিদ, যা মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও বলে: ‘আমি এখনো লড়ছি’।
বাবা মানে সেই অজেয় যোদ্ধা, যে কখনো মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে না—বসলেও শুধু সন্তানকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য।
বাবা মানে সেই অটল পাহাড়, যার চূড়ায় ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত এলেও ভিত কাঁপে না।
বাবা মানে সেই নীরব আগ্নেয়গিরি—বাইরে শান্ত, ভেতরে লাভা ফুটছে অবিরাম—যতক্ষণ না সংসার নিরাপদ, ততক্ষণ বিস্ফোরণ ঘটে না।
বাবারা হার মানে না—কারণ হার মানলে সন্তানের চোখের জল মুছে দেওয়ার হাতটা থেমে যায়।
বাবারা দুর্বল হয় না—কারণ দুর্বল হলে সন্তানের স্বপ্নের ডানা ভেঙে পড়ে।
বাবারা দরিদ্র হয় না—কারণ তাদের ধন সন্তানের হাসি, আর সেই ধন কেড়ে নেওয়ার সাধ্য কারো নেই।
বাবারা শুধু লড়ে যায়—নিঃশব্দে, নিরন্তর, অজেয়।”
হয়তো এটাই জীবন... আর চারিদিকে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ।
#বৃষ্টি_ভেজা_কাঁধে_সন্তানের_স্বপ্ন #বাবারা_হার_মানে_না #পিতার_ত্যাগ #জীবনের_লড়াই #পরির_স্বপ্ন #অভিকের_কষ্ট #ছোটগল্প #আবেগের_বৃষ্টি #ভাইরাল_গল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।