এক পা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিশির বিয়ের খবরটা অভিক প্রথম শুনেছিল এক কাপ চায়ের দোকানে।
রাকিব কীভাবে কথাটা তুলেছিল, এখন আর তার মনে নেই। শুধু মনে আছে, দোকানের বেঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় চায়ের ওপর সর জমেছিল। সে চামচ দিয়ে সরটা সরিয়ে কাপের ভেতর তাকিয়ে ছিল, যেন সেখানে অন্য কোনো খবর লেখা আছে। রাকিব বলেছিল, “আগামী শুক্রবার।”
অভিক মাথা তুলেছিল। “কার সঙ্গে?”
রাকিব একটু থেমে বলেছিল, “তুই চিনবি না।”
তারপর আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি অভিক। চায়ের দাম মিটিয়ে উঠে দাঁড়ানোর সময় পকেটে একশো বিশ টাকা ছিল। মাস শেষ হতে ছয় দিন বাকি। মায়ের ওষুধ কিনতে হবে। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সে কিছুক্ষণ ভেবেছিল, বাসে যাবে, নাকি হেঁটে। শেষ পর্যন্ত হেঁটেই ফিরেছিল।
নিশির সঙ্গে তার সম্পর্কটা কোনোদিন খুব নাটকীয় ছিল না। অফিস ছুটির পর দুজনে একসঙ্গে হাঁটত। কখনো ফুচকা খেত, কখনো রাস্তার পাশের দোকানে বসে চা। নিশি চায়ে কম চিনি খেত। অভিক সেটা জানত। নিশিও জানত, অভিক চা শেষ করার আগে কাপের তলায় জমে থাকা চিনি আঙুলের ডগা দিয়ে নেড়ে নেয়।
সমস্যা শুরু হয়েছিল নিশির বাবা অভিককে ডাকার পর। বড় কোনো অপমান করেননি তিনি। বরং খুব ভদ্রভাবে জানতে চেয়েছিলেন, অভিক কী করে, কত আয়, কোথায় থাকে, ভবিষ্যতে কী করার পরিকল্পনা আছে।
অভিক কিছু উত্তর দিয়েছিল সত্যি, কিছু উত্তর একটু বাড়িয়ে।
“নিজের একটা ব্যবসা করার ইচ্ছে আছে।”
“কতদিনের মধ্যে?”
“দুই-এক বছরের মধ্যে।”
নিশির বাবা মাথা নেড়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, “ইচ্ছা থাকা ভালো। কিন্তু সংসার ইচ্ছায় চলে না।”
কথাটা শুনে অভিকের ভালো লাগেনি। তবু সেদিন সে চুপ করেছিল।
বেরিয়ে আসার পর নিশি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “তুমি চাইলে আমরা চলে যেতে পারি।”
অভিক তাকিয়েছিল তার দিকে। “কোথায়?”
“তোমার বাসায়।”
“ওই এক কামরার বাসায়?”
নিশি কথাটা বলেই থেমে গিয়েছিল। যেন নিজের মুখ থেকেই বের হওয়া কথায় সে নিজেই একটু অস্বস্তিতে পড়েছে।
অভিকের মুখ শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে সে জামাটা খুলে অনেকক্ষণ বিছানায় বসে ছিল। ঘরের সিলিং ফ্যানটা কাঁপতে কাঁপতে ঘুরছিল। পাশের ঘর থেকে মায়ের কাশির শব্দ আসছিল। টেবিলের ওপর ওষুধের খালি পাতা।
নিশি ফোন করেছিল দুবার। অভিক ধরেনি। তৃতীয়বার ফোন আসার পর সে ফোনটা উল্টো করে বালিশের পাশে রেখে দিয়েছিল।
পরদিন নিশি জিজ্ঞেস করেছিল, “রাগ করেছ?”
অভিক বলেছিল, “না।”
“তাহলে ফোন ধরোনি কেন?”
“ব্যস্ত ছিলাম।”
মিথ্যেটা দুজনেই বুঝেছিল। কেউ আর কিছু বলেনি।
বিয়ের তিন দিন আগে নিশি এক সন্ধ্যায় বলেছিল, “আমি যদি এখন বলি, আমাকে নিয়ে চলো?”
অভিক জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। সে বলতে পারত—চলো।
কিন্তু তার মাথায় তখন ভাড়া, মায়ের ওষুধ, এক কামরার ঘর, মাসের শেষ, ধার করা টাকা—সব একসঙ্গে ঘুরছিল।
সে বলেছিল, “তুমি যেটা ভালো মনে করো, করো।”
নিশি আর প্রশ্ন করেনি।
দশ বছর পর এক বিকেলে ওষুধের দোকানের সামনে তাদের দেখা হয়েছিল।
প্রথমে নিশিই চিনেছিল।
“অভিক?”
অভিক ফিরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। নিশির চুলে পাক ধরেছে। চোখের কোণে সরু রেখা। হাতে একটা ওষুধের স্লিপ।
“মায়ের ওষুধ নিতে এসেছি,” নিশি বলেছিল।
অভিক মাথা নেড়েছিল। “আমিও।”
দুজনেই কিছুক্ষণ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এত বছর পর তাদের বলার মতো কথা ছিল অনেক, অথচ মুখে আসছিল খুব কম।
নিশি হঠাৎ বলল, “সেদিন তুমি যদি বলতে—চলো, আমি চলে আসতাম।”
অভিক হেসেছিল। হাসিটা খুব ছোট।
“আর তুমি যদি সেদিন বলতেই—ওই এক কামরার ঘরেই থাকব, তাহলে হয়তো আমিও সাহস পেতাম।”
নিশি তাকিয়ে রইল।
“আমরা তাহলে দুজনেই ভুল বুঝেছিলাম?”
অভিক একটু ভেবে বলেছিল, “হয়তো শুধু ভুল বুঝিনি। দুজনেই এক পা করে পিছিয়েছিলাম।”
ওষুধের দোকানের সামনে তখন ভিড় বাড়ছিল। একজন লোক তাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। দূরে একটা বাস হর্ন দিল।
নিশি স্লিপটা ব্যাগে রাখল।
“চা খাবে?”
অভিক বলল, “খাব।”
পাশের ছোট দোকানে গিয়ে দুজন বসেছিল। চা এলো দুটো কাপে। নিশি কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল।
অভিক চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর নিজের কাপে এক চামচ চিনি দিল। আরেক চামচ দিতে গিয়ে হাতটা থেমে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।