চারিদিকে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ ছোটগল্প
তারিখঃ ০৯ অক্টোবর ২০২৫
অভিক পার করছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলো। ভাগ্য যেন আবার
নির্মম আঘাত হেনেছে তার জীবনে।
নিম্নচাপের প্রভাবে সারাদেশে অবিরাম বৃষ্টি।
চারিদিকে কেবলই রিনিঝিনি শব্দ—জলকণার ছন্দে ভিজে যাচ্ছে শহর, আর সেই সুরের সাথে ভিজে যাচ্ছে অভিকের একাকী জীবনও।
রোগে আক্রান্ত অভিক আজ সারাদিন কাজ করেছে। হার্ট অপারেশনের পর চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাকে। চাকরি হারানোর পর থেকেই বুকের ব্যথাটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে, গোসল সেরে, নাস্তা করতে বসেই মনে পড়ে—
“চাকরিটা তো আর নেই…”
মুহূর্তেই যেন নিভে যায় জীবনের আলো।
অভিকের জীবনে যেন বয়ে গেছে এক প্রবল ঝড়।
সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও আজও কোনো চাকরি জোটেনি। কিন্তু সংসারের চাকা তো থেমে নেই।
অভিকের বড় মেয়ে পরি—শান্ত, মেধাবী, অনিন্দ্যসুন্দর মননশীল মেয়ে।
সব পরীক্ষায় প্রথম হয় সে।
এবার তার বিবিএ তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা, কিন্তু মাত্র ২৮,৫০০/- টাকা বকেয়া।
এই টাকার অভাবে হয়তো থেমে যাবে মেয়েটির পড়াশোনার পথ।
এর আগে বন্ধুদের সহযোগিতায় টিউশন ফি কোন রকমে জমা দেওয়া গিয়েছিল।
কিন্তু এবার অভিকের অনুরোধ শুনে কেউ কেউ ঠান্ডা গলায় বলল,
“সবার মেয়ে তো আর ভার্সিটিতে পড়ে না।”
শব্দগুলো কাঁটার মতো বিঁধে গেল অভিকের অন্তরে।
সকালবেলা পরি এখনও প্রস্তুতি নেয় ভার্সিটিতে যাবার। যখন বুঝতে পারে—এবার তার যাওয়া হবে না, তখন চোখের কোণে জমে থাকা শিশিরবিন্দু ঝরে পড়ে গোপনে।
চোখদুটি লাল হয়ে ওঠে, ঠোঁটে নীরব কান্না।
অভিক আর সহ্য করতে পারে না। বুকের ভিতরটা যেন ভেঙে যায় শব্দহীন বিস্ফোরণে।।হার্টের ব্যথা দ্বিগুণ হয়ে ওঠে, তবু সে চুপ করে থাকে।
সংসারের চাকা সচল রাখার জন্য অভিক তুলে নেয় অটো রিকসার হাতল। প্রথমদিকে হাত ফুলে যেত, পায়ের পেশি টনটন করত, রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হতো শরীরটা যেন নীল হয়ে গেছে ব্যথার দগদগে আঁচে।
তারপরও পরদিন সকালে আবার রিকশা নিয়ে বের হয় সে। ফোসকা পড়া হাতে পুনরায় ধরে সেই হাতল— কারণ বাবারা থেমে যায় না।
বৃষ্টির শব্দ যেন আরও ঘন হয়ে উঠেছে।
পরি এখন অনেক কিছু বুঝলেও, তার অন্তরে শিশুর মতো সরল একটা বিশ্বাস এখনো রয়ে গেছে।
অভিক হঠাৎ টের পেল মাথায় এক মৃদু স্পর্শ।
তাকিয়ে দেখে—পরি।
পরি কাঁপা গলায় বলল, “বাবা, তুমি আগে সুস্থ হও। একটা চাকরি পেলে, তারপর না হয় আবার আমি পড়ব।”
পরির কথায় অভিকের শান্ত জগৎ কেঁপে উঠল।
মনে হলো, স্থির জলে হঠাৎ ঝড় উঠেছে।
যে সংসারে প্রতিদিন মোটা চালের ভাত আর আলু ভর্তা জোটাতেই যুদ্ধ, সেখানে মেয়ের পড়ার টাকা জোগাড় করা কী অসম্ভব স্বপ্ন!
তবুও অভিক হাসিমুখে বলল,
“ঠিক আছে মামণি, আমি টাকার ব্যবস্থা করব।”
রাতের পর রাত বৃষ্টি।।কখন যে ঘুমিয়ে গেল অভিক, সে নিজেও জানল না।
পরদিন শুক্রবার, ফজরের আজানে ঘুম ভাঙল।
বাইরে তখনও প্রবল বৃষ্টি।
ভেজা শরীরে গ্যারেজে গেল সে। রিকশা নিয়ে বের হলো মাজা সমান পানিতে।
প্রথম যাত্রী উঠতেই শরীর কাঁপছে, কিন্তু অভিক থামছে না, আজ পরির টাকার ব্যবস্থা করতেই হবে।
বৃষ্টি, ঘাম, কাদা—সব মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।
দুপুরে রিকশা জমা দিয়ে বাসায় ফিরে এল সে।
শরীর ঠান্ডা, ঠোঁট ফ্যাকাসে, বুকের ব্যথা বাড়ছে।
দিনের আলো ফুটছে, আর সেই আলোয় অভিকের চোখে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে পরির মুখ।
সে বিড়বিড় করে বলছে,
“বাবারা কখনো দুর্বল হয় না…
বাবারা কখনো দরিদ্র হয় না…
বাবারা কখনো হারে না…
বাবারা কখনো হার মানতে শেখে না…”
তারপর—সব নিঃস্তব্ধ।
চারিদিকে কেবল বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ।
ফোনে খবর পেয়ে আমি ছুটে গেলাম অভিকের বাসায়। অচেতন অভিক মেঝেতে পড়ে আছে।
তাড়াতাড়ি গাড়ি ডেকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।
বাইরেও তখন মুষলধারে বৃষ্টি।
স্টিলের ট্রলিতে ঠেলে নেওয়া হচ্ছে অভিককে।
আমি কাচের দেওয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি—ডাক্তারদের নিরলস চেষ্টা চলছে,
কিন্তু বাইরে কেবলই বৃষ্টির শব্দ।
আজও যখন বৃষ্টি নামে, মানুষ বৃষ্টির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, আর আমি শুনতে পাই অভিকের বুকের গভীর কান্না,
বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দের সাথে মিশে যায় সেই অস্পষ্ট বাণী,
“বাবারা কখনো দুর্বল হয় না,
বাবারা কখনো দরিদ্র হয় না,
বাবারা কখনো হারে না,
বাবারা কখনো হার মানতে শেখে না।”
হয়তো এটাই জীবন,
আর চারিদিকে কেবলই বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ। 🌧️
#বাংলা_ছোটগল্প #মানবজীবন #বাবা #ত্যাগ #সংগ্রাম #ভালোবাসা #বৃষ্টি #অভিক_ও_পরি #MdZahidHossain #EmotionalFiction #BanglaLiterature #HeartTouchingStory
#enolej_idea
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।