চারজন, চারটি গোপন কষ্ট
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৯ আগস্ট ২০২৬
সেদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
ঘরটা এক মুহূর্তে অন্ধকার।
মিশি নিজের ঘর থেকে চিৎকার করে উঠল,
আবার গেল!
মেঘলা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল। নিশি রান্নাঘর থেকে একটা মোমবাতি এনে টেবিলের ওপর রাখল।
অভিকও এসে বসল।
চারজন।
অনেকদিন পর একই জায়গায়, কোনো টেলিভিশন নেই, কারও হাতে ল্যাপটপ নেই, ফোনের আলো ছাড়া অন্য কোনো ব্যস্ততাও নেই।
মোমবাতির ছোট শিখাটা বাতাসে কাঁপছিল।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
মিশি হঠাৎ বলল,
আমরা এত চুপচাপ কেন?
অভিক হেসে বলল,
চুপ করে থাকলে খারাপ কী?
খারাপ না। আগে তো আমরা অনেক কথা বলতাম।
অভিক নিচের অন্ধকার রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
তোরা বড় হয়ে গেছিস।
মেঘলা বাবার দিকে তাকাল।
তুমি এটা বললে কেন?
অভিক একটু হাসল।
এমনিই।
কথাটা সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত।
কিন্তু সেদিন যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে কথাগুলো শেষ করতে চাইছিল না।
অভিক কিছুক্ষণ পর ধীরে বলল,
মাঝে মাঝে মনে হয়, তোদের আর আমাকে খুব একটা দরকার নেই।
মেঘলা চুপ করে রইল।
নিশি মোমবাতির দিকে তাকিয়ে ছিল।
মিশি বলল,
আমাদের দরকার আছে বাবা।
অভিক মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
জানি।
নিশি এতক্ষণ কিছু বলছিল না।
হঠাৎ বলল,
আমারও একটা কথা আছে।
তিনজন তার দিকে তাকাল।
নিশি মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি।
কথাটা বলার পর সে আর কিছু বলল না।
মেঘলা মায়ের হাতের দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে হাতটা নিজের হাতে নিল।
কিছুক্ষণ পর মেঘলা বলল,
আমারও একটা কথা আছে।
অভিক তাকাল।
আমি অন্য শহরে চাকরি করতে চাই।
নিশি মাথা তুলল।
অভিক কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
তুই যেতে চাস?
হ্যাঁ।
তাহলে যাস।
মেঘলা অবাক হয়ে গেল।
তুমি রাগ করবে না?
রাগ করব কেন?
মেঘলা কিছু বলল না।
চোখ নামিয়ে নিল।
মিশি এতক্ষণ চুপ করে বসেছিল। এবার সে নিজের হাঁটুর ওপর রাখা হাত দুটো শক্ত করে ধরল।
আমারও মাঝে মাঝে খুব একা লাগে।
অভিক তাকাল।
তুই তো সবসময় বন্ধুদের সঙ্গে থাকিস।
মিশি একটু হেসে বলল,
অনেক মানুষের মাঝেও একা লাগতে পারে।
নিশি মেয়েটাকে কাছে টেনে নিল।
মিশি মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
কেউ কোনো বড় কথা বলল না।
কেউ বলল না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বারান্দার বাইরে তখনও অন্ধকার।
দূরের কোনো বাড়ির ছাদে একটা মোমবাতির আলো দেখা যাচ্ছিল।
অভিক মেঘলার দিকে তাকাল। মেঘলা মিশির চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। নিশি চুপ করে বসে ছিল।
কিছুক্ষণ পর মিশি উঠে দাঁড়াল।
চা বানাব?
নিশি হেসে বলল,
আজ আমি বানাব না।
মেঘলা বলল,
আমি বানাচ্ছি।
অভিক উঠে দাঁড়াল।
আমি পানি দিচ্ছি।
মিশি বলল,
তাহলে আমি কাপ আনছি।
চারজন ভেতরে ঢুকে গেল।
বারান্দায় মোমবাতিটা তখনও জ্বলছিল।
বিদ্যুৎ ফিরে এসেছিল।
তবু কেউ মোমবাতিটা নেভাতে গেল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।