মিষ্টি কাগজের অপ্রেরিত চিঠি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ২৪ মে, ২০২৬
অভিক সেদিন বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরেই ছিল। ঘুম ভাঙা আর আবার ঘুমিয়ে পড়ার মাঝখানে দিনটা কেটে যাচ্ছিল, যেন শরীরটা সময়ের সঙ্গে ঠিকমতো তাল মেলাতে পারছে না। বিকেলের দিকে হঠাৎ বুঝতে পারল, ভেতরে একটা শূন্যতা জমে আছে। নাম না জানা, তবু খুব পরিচিত—ক্ষুধা।
রান্না করার মতো ইচ্ছা বা শক্তি নেই। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ঠিক করল, নিচে নেমে কিছু নিয়ে আসবে।
সিঁড়ি নামতে নামতে বাতাসটা ঠান্ডা লাগল। নিচে নামতেই দোকানের সামনে ফুটন্ত তেলের শব্দ কানে এল। জিলাপি ভাজা হচ্ছে ধীরে, নিয়ম মেনে। গরম তেলের ভেতর থেকে উঠছে টকটকে পাক, আর তার গন্ধটা পরিচিত হলেও আজ একটু তীক্ষ্ণ।
সে কয়েকটা জিলাপি নিয়ে নিল।
বাসায় ফিরে কম্পিউটার খুলে কাজ শুরু করল। পাশে রাখা কাগজের ঠোঙা থেকে একে একে জিলাপি খেতে লাগল। প্রথম কামড়েই গরম রসটা জিভের পাশে ছড়িয়ে গেল। আঙুলে আঠা লেগে থাকল, তবু টাইপ থামল না। কাজ আর খাওয়ার মাঝখানে সময়টা একটু হালকা হয়ে এলো—বড় কিছু না, কিন্তু টিকে থাকার মতো।
কাজ শেষ হলে সে উঠে হাত ধুতে গেল।
ফিরে এসে চোখ পড়ল ঠোঙাটার ওপর।
সাধারণ কাগজের ঠোঙা নয়। ভেতরের দিকে গোটা গোটা হাতে লেখা কিছু লাইন। কালি কোথাও ছড়িয়ে গেছে, কোথাও শব্দ চাপা পড়ে আছে। পড়তে গিয়ে মনে হলো, এটা তাড়াহুড়োর লেখা নয়—বরং অনেকক্ষণ চুপ থেকে লেখা।
অভিক ঠোঙাটা খুলে পড়তে শুরু করল।
“পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকে যারা বাইরে রাগের আড়ালে নিজের নরম দিকটা লুকিয়ে রাখে। নীলা তাদের একজন।
নিজের সঙ্গে অভিনয় করা সহজ না। তবু তাকে প্রতিদিন সেটা করতে হয়।
হয়তো একটা ঘটনা তাকে বদলে দিয়েছে। তারপর থেকে পুরুষ মানুষ দেখলেই সে শক্ত হয়ে যায়। রাগটা জমে থাকে, আর মাঝেমধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু ভেতরে কোথাও সে জানে—একজনের ভুল দিয়ে সবাইকে মাপা যায় না।
সেই বোঝাটা তার ভেতরে ধীরে ধীরে জায়গা নিচ্ছে।
হয়তো একদিন নীলার ভেতরের নরম অংশটা রাগের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসবে। হয়তো না।”
চিঠিটা শেষ করে অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
স্ক্রিন তখনো জ্বলছে, কিন্তু তার মন সেখানে নেই। আঙুল দিয়ে সে ঠোঙার ভাঁজ ছুঁয়ে দেখল। তেল, মিষ্টি আর কাগজের গন্ধ একসাথে মিশে আছে।
সে নিশ্চিত নয়, এমন করে কেউ এখনো কাগজে নিজের কথা রেখে যায় কি না।
অভিক ঠোঙাটা ফেলে দিল না। ভাঁজ করে টেবিলের পাশে রেখে দিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।