একটি জুতো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ২০, ২০২৬
রাফি রাস্তায় হাঁটছিল।
হঠাৎ তার জুতোর সামনের দিকটা ছিঁড়ে গেল। শব্দটা ছোট—একটা শুকনো সেলাই ছাড়ার মতো। তবু সে থামল।
পা তুলে দেখল। আঙুলের কাছে চামড়া ফেটে গেছে। ভেতরটা দেখা যাচ্ছে। হাত দিয়ে চাপ দিল—ধরে রাখা যায় না। জুতোর ভেতরটা ফাঁপা লাগে।
সে পা নামাল। মাটিতে পুরোটা ঠেকে না। মাঝখানে ফাঁক।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
পাশ দিয়ে একজন লোক যাচ্ছিল। তার চোখ নিচে নামল।
এক মুহূর্ত। তারপর সে চোখ তুলে নিল।
হাঁটা থামাল না।
রাফি তাকিয়ে রইল। মনে হলো—লোকটা দেখেছিল। হয়তো না।
আরেকজন এল। তার চোখও নামল। এইবার দ্রুত।
একটু থামতে গিয়েও থামল না। চলে গেল।
রাফি আবার হাঁটা শুরু করল।
বাড়িতে মা কাপড় ধুচ্ছিলেন। সাবানের ফেনা জমে আছে। হাতের আঙুল সাদা।
রাফি জুতোর ফাটা দিকটা একটু তুলে ধরল।
মা তাকালেন। খুব অল্প সময়।
তারপর বললেন, “আবার ছিঁড়বে। কাল দেখিস।”
তিনি আবার কাপড়ে মন দিলেন। রাফি কিছু বলল না। জুতো খুলে রাখল।
ভেজা মাটিতে ছেঁড়া অংশটা ছড়িয়ে পড়ে রইল। জল গড়িয়ে এসে ছুঁয়ে গেল। কাদা মিশে গেল।
সে পা তুলে দেখল। লালচে দাগ। ফোস্কা উঠছে।
সে পা নামিয়ে নিল। পরদিন সে আবার সেই জুতোই পরল।
ছেঁড়া অংশটা শক্ত হয়ে গেছে। হাঁটলে ওঠে, নামে—ভেঙে পড়ে না।
রাস্তার পাশে একটা দোকানের কাঁচে জুতো সাজানো। চকচকে।
রাফি থামল। কাঁচে নিজের পা দেখল। জুতো কাত হয়ে আছে।
এক মুহূর্ত। তার মনে হলো—ওটা তার পা না।
সে সরে গেল।
স্কুলের দরজায় শিক্ষক দাঁড়িয়েছিলেন।
রাফি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি নিচে তাকালেন।
চোখ থামল।
তারপর তিনি বললেন, “ভিতরে যাও।”
আর কিছু না।
রাফি দাঁড়িয়ে ছিল এক মুহূর্ত।
তার ঠোঁট নড়ল—
কিছু বলার মতো।
শব্দ বের হলো না
সে ভেতরে ঢুকে গেল।
ক্লাসে বসে পা মাটিতে রাখতেই চাপ লাগল। ফোস্কায় ঘষা খেল।
সে পা একটু সরিয়ে নিল।
পাশের ছেলেটা তাকাল। বলল,“তোর—”
থেমে গেল। খাতা খুলে ফেলল।
ছুটি হলে সবাই দৌড়ে বেরিয়ে গেল
রাফি ধীরে হাঁটছিল।
হঠাৎ সে থামল। পা থেকে জুতোটাকে খুলে ফেলল।
খালি পা মাটিতে রাখল। ঠাণ্ডা লাগল। কাঁকর লাগল।
সে জুতোটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আঙুল দিয়ে ছেঁড়া অংশটা টানল।
আরও ছিঁড়ে গেল। সহজে।
সে থামল না।
দুই হাতে ধরে সামনের অংশটা আলাদা করল।
রাস্তার পাশে ড্রেনের কাছে সে দাঁড়াল।
চারপাশে মানুষ। কেউ তাকাচ্ছে—কেউ না।
সে নিচু হয়ে জুতোর ছেঁড়া অংশটা মাটিতে রাখল।
একটু চাপ দিল।
যেন ঠিক জায়গায় বসাতে চায়।
তারপর হাত সরিয়ে নিল।
অর্ধেকটা মাটিতে রইল।
অন্য অর্ধেকটা তার পায়ে।
সে হাঁটতে শুরু করল।
এক পায়ে জুতো। আরেক পা খালি। কাঁকর লাগছে। থামতে ইচ্ছে করে।
সে থামে না।
একজন লোক পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে নিচে তাকাল। এইবার একটু বেশি সময়।
তার হাঁটা ধীর হলো।
মনে হলো, সে কিছু বলবে—
সে বলল না।
চলে গেল।
বিকেলের আলো নরম।
রাফি বাড়ির দিকে হাঁটছে।
পেছনে, ড্রেনের ধারে, অর্ধেক জুতোটা এখনও পড়ে আছে।
একটা কুকুর এসে শুঁকল। নাড়াল।
তারপর চলে গেল।
একজন মানুষ পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।
তার পা প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল জুতোটাকে।
সে থামল। নিচে তাকাল।
এই লোকটা কি একটু আগে তার পাশ দিয়ে যায়নি?
সে পা তুলে জুতোটাকে এড়িয়ে গেল।
চলে গেল।
রাফি বাড়িতে ঢুকল।
মা উঠোনে। তিনি তার পায়ের দিকে তাকালেন।
এইবার একটু বেশি সময়। তার ঠোঁট নড়ল।
তিনি কিছু বললেন না।
রাতে দরজার পাশে জুতোর বাকি অংশটা পড়ে থাকে।
রাফি তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ।
তারপর আলো নিভে যায়।
পরদিন সকালে সে আবার বের হয়।
এক পায়ে জুতো। আরেক পা খালি।
সে হাঁটতে থাকে।
পেছনে, ড্রেনের ধারে, অর্ধেক জুতোটা এখনও পড়ে আছে।
কাদায় ঢুকে গেছে একটু।
মানুষ আসে, যায়।
কেউ তাকায়। কেউ থামে না।
কেউ কি থেমেছিল—নাকি সে ভুল দেখেছে।
জুতোটার ভেতরটা আর দেখা যায় না।
কাদা ঢেকে দিয়েছে।
ধীরে ধীরে, সেটা জুতো বলে মনে হয় না।
তবু সেটা পড়ে থাকে—নাকি পড়ে ছিল।
কেউ তা তুলে নেয় না।
কেউ তা সরায় না।
আর ঠিক কোথায় ছিল—
এবং কেউ নেই যে জানে—কি সত্য, কি ভুল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।