গ্রহের দোষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২ অক্টোবর ২০২৬
সুমন জানত, তার শনি খারাপ। পাড়ার জ্যোতিষী কুণ্ডলী দেখে বলেছিলেন - চাকরি নেই, বিয়ে ভাঙছে, হাতে টাকা টিকছে না, সব শনির দশা।
"সময়টা ভালো না। ধৈর্য ধরতে হবে।"
সুমন কথাটা গেঁথে নিয়েছিল। কাজ আটকালেই বলত, "শনি ভাই ছাড়ছে না।" বন্ধুরা হাসত। সে হাসত না।
এক সকালে মা বললেন, "বাজার থেকে ফেরার সময় বাবার ওষুধটা আনিস।"
সুমন মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল, "কাল আনব।"
"কাল তো দুদিন ধরেই বলছিস।"
"টাকা নেই।"
মা চুপ করে গেলেন।
অথচ সেদিন বিকেলেই তার হাতে পাঁচশো টাকা এসেছিল। বন্ধুর কাছ থেকে ধার করা। ওষুধ কেনার কথা। ফেরার পথে একটা টি-শার্ট দেখে দাঁড়িয়ে গেল। তিনশো পঞ্চাশ টাকা। পছন্দ হয়ে গেল।
পরদিন কিনবে ভেবে টি-শার্টটা কিনে ফেলল।
রাতে বাবা ওষুধের কথা বললেন না। শুধু বললেন, "কাল হাসপাতালে যাবি?"
"দেখি।"
পরদিন সকাল থেকে আবার রিল। একটা, তারপর আরেকটা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। হঠাৎ স্ক্রিনের ওপর চোখ আটকাল। চার ঘণ্টা চলে গেছে।
সন্ধ্যায় রাকিব এসে বলল, "জ্যোতিষীর কাছে আবার যা। রাহুও খারাপ মনে হয়।"
"রাহু কী করল?"
"সারাদিন রিল দেখছিস। রাহু মাথা ঘুরাচ্ছে।"
সুমন উড়িয়ে দিল।
রাতে নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি হলো। চেয়ারে তিনটা ময়লা জামা, টেবিলে কালকের চায়ের কাপ, বিছানার পাশে কাগজের স্তূপ। একটা জামা তুলে নাকে নিল। আবার রেখে দিল। কবে ধোয়া হয়েছে মনে নেই।
পরদিন সে আবার জ্যোতিষীর কাছে গেল। লোকটা হাত দেখে বললেন, "শুক্র দুর্বল।"
"শুক্র কেন?"
"পরিচ্ছন্নতা, রুচি - এসব শুক্রের ব্যাপার।"
তারপর বললেন, "নিজের জীবনযাপনটা একটু ঠিক করো।"
ফেরার পথে কথাটা মাথায় ঘুরছিল। শুক্র দুর্বল, নাকি সে নিজেই নিজের যত্ন নেয় না? প্রশ্নটা প্রথমবার এলো।
ঘরে ফিরে কাপড় ধুতে দিল। টেবিল মুছল।
কয়েকদিন পর রাকিব টাকা চাইল। সুমন বলল, "দুই দিন দে।"
দুই দিন পর রাকিব ফোন করল। সুমন ধরল না। তৃতীয় দিনও না। চতুর্থ দিন রাকিব সামনে এসে বলল, "দিতে পারবি না বললেই হয়। ফোন ধরিস না কেন?"
সুমন বলল, "শনি খারাপ যাচ্ছে। সব আটকে আছে।"
রাকিব হাসল না। বলল, "তোর শনি খারাপ, নাকি তুই টাকা ফেরত দিস না?"
সুমন চুপ করে গেল।
সেদিন রাতে একটা খাতা বের করল। প্রথম পাতায় লিখল -
আমার সমস্যা কোথায়?
নিচে লিখল -
চাকরি নেই, সকালে দেরিতে উঠি, সিভি দিয়ে খোঁজ নিই না, দিনে অনেক ঘণ্টা ফোন দেখি, ধার ফেরত দিতে দেরি করি, বাবার ওষুধ আনতে ভুলি।
শেষ লাইনে হাত থেমে গেল। লিখল -
তাহলে গ্রহগুলো আসলে কোথায়?
পরদিন একটা ছোট বই কিনল। প্রতিদিন দশ পাতা পড়বে ঠিক করল। ফোনের সময় কমাল। প্রতিদিন তিনটা করে চাকরির আবেদন করতে লাগল। রাকিবের টাকা একবারে দিতে পারল না, মাসে মাসে অল্প করে দিতে শুরু করল।
তিন মাস পর একটা চাকরি হলো। বেতন বেশি না। প্রথম বেতন পেয়ে বাবার ওষুধ কিনল। ফেরার সময় একটা পারফিউমও কিনল।
মা বললেন, "তুই তো এসব কিনতিস না।"
সুমন হেসে বলল, "আগে ভাবতাম শুক্র খারাপ। এখন মনে হয় জামাটা পরিষ্কার রাখাও আমারই কাজ।"
মা পুরোটা বুঝলেন না। হাসলেন।
রাতে খাতাটা আবার খুলল। আগের প্রশ্নের নিচে একটা লাইন যোগ করল -
গ্রহ আকাশে থাকুক। ছায়া পড়ে আমার কাজের মধ্য দিয়ে।
খাতা বন্ধ করে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল। আজ রিল দেখতে ইচ্ছে করছিল।
তবু তুলল না। কাল সকালে অফিস আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।