রজনীগন্ধার দিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ১৯,২০২৬
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছি। সামনের ফাঁকা জায়গাটায় ছোট্ট একটা খরগোশ ছানা বসে আছে—দুপুরের রোদে গা এলিয়ে দিয়েছে। এতটাই নিশ্চিন্ত, যেন পৃথিবীতে কোনো তাড়া নেই।
তাকিয়ে থাকি। ওর দিকে না, আসলে নিজের ভেতরের এক শূন্যতার দিকে।
গত রাতে ঘুম আসেনি। চোখ বন্ধ করলেই তুমি এসে দাঁড়াচ্ছিলে—অভিমানী মুখে, একটু হেসে, আবার হঠাৎ চুপ করে। ঘুমের ভেতরেও তোমাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না, আর জেগে থাকলে তো আরও না।
চোখের নিচে ভার জমেছে। আয়নায় তাকিয়ে মনে হলো—চশমা দরকার। হয়তো চোখের জন্য না, স্মৃতিগুলোকে একটু ঝাপসা করার জন্য।
আজ চশমা পরব, সাদা পাঞ্জাবিটাও পরব।
আলমারির ভেতর থেকে বের করতেই কাপড়টা একটু কুঁচকে উঠল। অনেকদিন পর পরছি। এই পাঞ্জাবিটা তোমার খুব পছন্দের ছিল। একবার তুমি মজা করে বলেছিলে, “এইটা পরে থাকলে তোমাকে অন্যরকম লাগে।”
তারপর একদিন নিজের হাতে এর ভেতরের পাশে আমার নাম লিখে দিয়েছিলে। কালো সুতো দিয়ে, একটু বাঁকা অক্ষরে।
আজ খুঁজলাম—পেলাম না।
হয়তো ধুতে ধুতে মুছে গেছে।
অথবা… আমি খেয়াল করিনি কখন হারিয়ে গেছে।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে একটু থামলাম। মনে হলো কিছু একটা বাদ পড়ছে। তারপর মনে পড়ল—ফুল।
মোড়ের ছোট্ট টিনের ছাউনির দোকানটা এখনো আছে।
ফুলওয়ালাকে আগেই বলে রেখেছিলাম—রজনীগন্ধা চাই।
সে আমাকে দেখেই বুঝে ফেলল। কিছু বলল না। শুধু এক গুচ্ছ ফুল এগিয়ে দিল।
সাদা, লম্বা, এক ধরনের নিরব সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফুল।
রাস্তাটা খুব চেনা। তবু আজ অন্যরকম লাগে।
হয়তো আমি বদলেছি, তাই সবকিছু বদলে গেছে।
হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম—আজ তুমি কী বলবে?
হয়তো রাগ করবে।
হয়তো বলবে, “এত দেরি করলে কেন?”
উত্তর দেব না।
জানি, তুমি উত্তর চাও না—তুমি শুধু সেই দেরিটা টের পেতে চাও।
কবরস্থানে ঢোকার আগে চশমাটা চোখে দিলাম।
কোনো লাভ হলো না। তোমার নামটা পাথরে জ্বলজ্বল করছে।
কবরস্থানে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা নীরবতা আমাকে ঘিরে ধরল। বাইরে রোদ ছিল, এখানে ছায়া।
গাছের পাতা নড়ছে, কিন্তু শব্দ নেই।
তোমার কবরটা খুঁজে পেতে সময় লাগে না।
অজান্তেই ঠিক জায়গায় চলে আসি।
মাটিটা একটু উঁচু হয়ে আছে। নাম লেখা পাথরটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
মনে হলো তুমি জিজ্ঞেস করলে—তাহলে তোমার মনে আছে?
হালকা হাসি চলে আসে।
কিছু বলি না।
ফুলগুলো তোমার কবরের ওপর রাখি।
রজনীগন্ধার গন্ধ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
মনে হয় তুমি হাসছ।
চোখে সেই চেনা মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছ।
বলতে চেয়েছিলাম—ঘড়িটা আর চলছে না।
তোমার দেওয়া সেই ঘড়ি।
সময় থেমে গেছে, ঠিক যেদিন তুমি গিয়েছিলে।
কিন্তু বললাম না।
তুমি আবার জিজ্ঞেস করবে, “আর কী এনেছ?”
কী বলব? এখনও বেতন হয়নি।
তবু পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করি।
তোমার পায়েল।
অনেকদিন আগে খুলে রেখেছিলে। বলেছিলে, “হারিয়ে ফেলো না।”
আমি রাখিনি ঠিকমতো।
আজ আবার নিয়ে এসেছি।
বাক্সটা খুলে তোমার কবরের পাশে রাখি।
মনে মনে ভাবি—যদি পারতাম, আবার পরিয়ে দিতাম তোমার পায়ে।
হয়তো তুমি রাগ করে বলবে, “এতদিন কোথায় ছিলে?”
উত্তর দিই না।
কারণ সত্যিটা খুব সহজ—এই দেরিটুকুই বাঁচিয়ে রাখে তোমাকে।
কখন যে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে, টের পাইনি।
সূর্যের আলো নরম হয়ে আসে।
ছায়া লম্বা হয়।
আজ তোমার চলে যাওয়ার বার্ষিকী।
সময় হচ্ছে, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াই।
ফুলগুলো তোমার বুকের ওপর রেখে দিই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।