শেষ পর্যন্ত বলা হয়নি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২১ জুন, ২০২৬
বাবার মৃত্যুর পনেরো দিন পরে অভিক প্রথমবার তাঁর ঘরে ঢুকল।
এই পনেরো দিনে বাড়ির সবকিছুই যেন বদলে গেছে। অথচ বাইরে থেকে দেখলে কিছুই বদলায়নি। একই উঠান, একই বারান্দা, একই ঘর। শুধু মানুষটা নেই।
বাবার ঘরের দরজাটা খুলতেই অভিক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
ঘরটায় এখনও বাবার পরিচিত গন্ধ। পুরোনো বই, ওষুধ আর চন্দন সাবানের মিশ্রিত একটা গন্ধ। জানালার পাশে কাঠের টেবিলটা আগের জায়গাতেই আছে। টেবিলের ওপর চশমা, কয়েকটা কলম, কিছু কাগজ আর পুরোনো ক্যালেন্ডার।
মা কয়েকদিন ধরেই বলছিলেন, ঘরটা গুছিয়ে ফেলতে। অভিক পারছিল না। মনে হতো, জিনিসগুলো সরিয়ে ফেললেই বাবার শেষ চিহ্নটুকুও হারিয়ে যাবে।
সেদিন ধীরে ধীরে ড্রয়ার খুলতে লাগল সে।
প্রথম ড্রয়ারে কিছু কাগজপত্র। দ্বিতীয়টায় ব্যাংকের পুরোনো রসিদ।
নিচের ড্রয়ার খুলতেই একটা নীল মলাটের খাতা চোখে পড়ল।
ডায়েরি। বাবার হাতের লেখা চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
অভিক যেকোনো একটা পাতা খুলে ফেলল। মাঝের একটা পাতা।
তারিখটা দেখে থেমে গেল। যেদিন সে জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
নিচে লেখা,
"আজ অভিকের রেজাল্ট।
জিপিএ ৫।
সবাই খুশি।
আমিও।
ওকে বললাম, ভালো হয়েছে।
আর কী বলব বুঝি না।"
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
এই দিনটার কথা তার মনে আছে। সেদিন তার মন খারাপ হয়েছিল। বন্ধুদের বাবারা ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে ধরছিলেন, ছবি তুলছিলেন, মিষ্টি কিনে দিচ্ছিলেন।
তার বাবা শুধু বলেছিলেন, "ভালো হয়েছে।"
তখন মনে হয়েছিল, বাবা হয়তো তেমন খুশি হননি।
বাবা খুশি ছিলেন। শুধু বলতে পারতেন না।
অভিক ডায়েরিটা বন্ধ করল। টেবিলের ওপর রাখা বাবার চশমাটা হাতে নিল। একপাশ একটু ঢিলে হয়ে গেছে।
মনে পড়ল, বাবা একদিন বলেছিলেন ঠিক করিয়ে দিতে। করা হয়নি।
সে আবার ডায়েরি খুলল। সামনের দিকে কয়েকটা পাতা উল্টাল।
এক জায়গায় লেখা,
"আজ সাইকেল থেকে পড়ে গেল।
হাঁটুতে চামড়া উঠে গেছে।
দৌড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল।
যাইনি।
নিজে উঠেছে।"
চারটা ছোট বাক্য।
সেদিন সে ভেবেছিল, বাবা তাকে পড়ে থাকতে দেখেও এগিয়ে আসেননি। আজ মনে হচ্ছে, হয়তো দেখছিলেন বলেই আসেননি।
বাইরে থেকে মায়ের ডাক এল।
"অভিক?"
সে চমকে উঠল।
"হ্যাঁ?"
"চা দিব?"
"দাও।"
নিজের গলার ভার সে নিজেই টের পেল।
ডায়েরির পাতা আবার উল্টাতে লাগল।
একটা পাতায় লেখা,
"আজ চলে গেল।
ঘর ফাঁকা।
রাতে ওর ঘরে গিয়েছিলাম।
অন্ধকার।"
অভিকের হাত থেমে গেল।
ঢাকায় আসার পর কতবার বাবা ফোন করেছিলেন? কতবার সে বলেছে, "বাবা, এখন ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।"
হিসাব নেই। মনে হয়েছিল, পরে তো সময় থাকবেই।
শেষের দিকের পাতাগুলোতে বাবার হাতের লেখা কাঁপা কাঁপা। কোথাও একটা শব্দ কেটে আবার লেখা। এক জায়গায় তারিখও ভুল।
শেষ লেখাটার তারিখ বাবার মৃত্যুর এক মাস আগে।
"শরীর ভালো না।
অভিকের কথা মনে হয়।
ভালো বাবা ছিলাম কি না জানি না।
চেষ্টা করেছি।
যদি কখনো এটা পড়ে,
ওকে নিয়ে গর্ব ছিল, আছে।"
এরপর আর কোনো লেখা নেই। পাতাটা ফাঁকা।
অভিক অনেকক্ষণ সেখানেই বসে রইল।
বাইরে তখন মাগরিবের আজান শুরু হয়েছে। ঘরটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে।
সে ডায়েরিটা বন্ধ করে বুকের কাছে চেপে ধরল।
মাথার ভেতর শুধু বাবার সেই পরিচিত কণ্ঠস্বরটা ফিরে আসছিল,
"ভালো হয়েছে।"
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।