যে স্বপ্ন আর ফিরবে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | জানুয়ারি ২৬, ২০২৬
সকাল পাঁচটা।মিরপুরের সরু গলি। ছোট্ট ফ্ল্যাট। বাতি জ্বলছে। দেয়ালে পুরনো পোস্টার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো। লাল অক্ষরে লেখা—
“Future BCS Officer.”
আলো সোহেলের চোখে পৌঁছায় না, সে উঠে। বাবার পাশে যায়। বাবা শুয়ে। চোখ বন্ধ। ঘুম নয়।
হার্ট অ্যাটাকের পর হাসি বন্ধ।
সোহেল ওষুধ টেবিলে রাখে, মায়ের জন্য চা বানায়।
রিয়াকে ডাকে।
“আজ স্কুলে যাবি?”
রিয়া মাথা নাড়ে। চোখে ভয়, দুই মাসের ফি বাকি।
মা রান্নাঘরে। চুপ,বাবা টিভির সামনে। চোখ টিভিতে নয় দূরে।
সোহেল জানে। বাবা ভাবছেন—“আমার ছেলে সব ছেড়ে দিল।”কিন্তু বলেন না।
শুধু মাঝে মাঝে— “তুই একটু বিশ্রাম নে।”
সোহেল হাসে।“বাবা, আমি ঠিক আছি।”
প্রথম দুই বছর। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ডিপার্টমেন্টের পরিচিত মুখ।
শিক্ষকরা বলতেন—“এই ছেলে বিসিএস দিলে বড় অফিসার হবে।”
বন্ধুরা রাত জাগত। স্বপ্ন দেখত,দেশ, পরিবার আর নিজের ভবিষ্যৎ।
তৃতীয় বছর, সব উল্টে গেল।
এক রাত। বাবার হার্ট অ্যাটাক।
রাত দুটো। হাসপাতাল।
ডাক্তার—“অ্যানজিওপ্লাস্টি লাগবে।” বিল—দুই লাখের ওপর।
সঞ্চয় শেষ, মা গয়না বেচলেন, বোনের স্কুল বন্ধ।
সোহেলের সামনে দুটো পথ,পড়া চালানো নাকি পরিবার বাঁচানো।
সে বেছে নিল দ্বিতীয়টা।
বন্ধুরা ফোন করল—“তুই পাগল?
শুধু একটা বছর!”
সে হাসল,“পরিবার ছাড়া কিছুই হয় না।”
এখন দিন কাটে বাইকে। সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা। রোদে পোড়া। বৃষ্টিতে ভেজা।
কাস্টমার চিৎকার করে ধন্যবাদ কেউ দেয় না।
তবু সে হাসে,“ভাইয়া, ঠিক আছে।”
রাতে বাড়ি ফিরে।
বাবা টিভির সামনে। চোখে অপরাধ।
“সোহেল, তুই কেন এত কষ্ট করিস?”
সোহেল—“কষ্ট না বাবা। এটা দায়িত্ব।”
সবাই ঘুমালে সে ছাদে যায়। ফোন নিয়ে।
ভয়েস নোট বাবার গলা। কয়েক বছর আগের।
কাঁপা গলা ভরা আশা।
“সোহেল… আমার ছেলে। তুই একদিন বড় অফিসার হবি। আমি গর্ব করব। আমার বুক ফুলে উঠবে যখন লোকে বলবে—ওই তো সোহেলের বাবা। তুই পড়। কষ্ট কর। আমি তোর জন্য দোয়া করি। তুই যেন কখনো হার না মানিস। আমি তোকে বিশ্বাস করি, বাবা। তুই পারবি। আমার সোনা ছেলে… তুই আমার স্বপ্ন।”
শেষ হয়, সোহেলের আঙুল ডিলিট বাটনে।
চাপতে পারে না ফোন বুকে চেপে শোয়।
চোখ ভিজে।
একদিন সন্ধ্যা জোর বৃষ্টি। বাইক মাঝরাস্তায় বন্ধ।
কাস্টমার চিৎকার করে চলে গেল, সোহেল ভিজতে ভিজতে ফিরল।
দরজা খুলতেই মায়ের কান্না। “সোহেল… বাবার শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। ডাক্তার বলছে বাইপাস লাগবে। আরও তিন লাখ।”
পকেটে ৯৫০ টাকা। সে বাবার হাত ধরল।
“আমি ঠিক করে নেব বাবা।”
রাত, বৃষ্টি, ঝড় ছাদে দাঁড়াল।
প্রথমবার চিৎকার করল—“আমি আর পারছি না!”
চিৎকার ভাঙল গলা ফেটে গেল।
“স্বপ্ন তো দূর… বেঁচে থাকাটাই যন্ত্রণা!”
নিচ থেকে রিয়ার কান্না। “ভাইয়া… তুমি কোথায়?”
সে নামল,বোনকে জড়াল।
“আমি আছি, আমি আছি।”
পরদিন সকাল আবার বাইক।
আবার রাস্তা।
একই হাসি।
চোখে আলো নেই।
চক্র চলবে, টাকা আসবে যাবে।
অসুখ বাড়বে, স্বপ্ন ফিরবে না।
বাবা বলেন—“তুই আমার জন্য সব করলি।”
সোহেল মনে মনে বলে—“না বাবা। আমি নিজের জন্য কিছুই করিনি।”
কিন্তু বলে না সবাই ভেঙে পড়বে।
তাই সে চুপ।
আর চলে,চলে। চলে।
প্রতিদিনএকই রাস্তা, একই বাইক।
ভেতরে ফাঁকা, যেখানে একদিন ছিল—
বিসিএসের স্বপ্ন আর ফিরবে না।
#কষ্টেরগল্প #SadStory #ইমোশনালগল্প #স্বপ্নছাড়া #YouthPain #বিসিএসস্বপ্ন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।