অভিকের নীরব পতন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০২, ২০২৬
অভিককে আমি প্রথম যেভাবে চিনেছিলাম, সেটা খুব নাটকীয় কিছু নয়। বরং অস্বস্তিকরভাবে সাধারণ। এমন মানুষ, যাকে একসময় সবাই চিনত, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে চিনলেও আর ঠিক করে দেখা হয় না।
২০১২ সাল থেকে তার শরীর ধীরে ধীরে তাকে সহ্য করা বন্ধ করে দেয়। হার্টের সমস্যাটা শুরুতে যতটা রোগ ছিল, পরে তা হয়ে ওঠে একটা দীর্ঘ উপস্থিতি—যেটা ঘরের আলো-আঁধারেও নিজের মতো করে টিকে থাকে। দিনে দিনে তার চলাফেরা কমে আসে, কিন্তু সেটাকে কেউ খুব বড় ঘটনা হিসেবে দেখে না। বরং ধীরে ধীরে একটা অভ্যাস তৈরি হয়—সে “কম সক্রিয়”, “কম কথা বলে”—এই ধরনের বাক্যেই তাকে ব্যাখ্যা করা শুরু হয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই রোগ একা ছিল না। তার পাশে ছিল মানুষের আচরণও—যেটা কোনোদিন সরাসরি আঘাত করে না, কিন্তু সময়ের সাথে ভেতরটা খালি করে দেয়। আগে যে মানুষকে ঘিরে ব্যস্ততা ছিল, পরে তাকে ঘিরে তৈরি হয় এক ধরনের নীরব এড়িয়ে চলা। কেউ ব্যস্ত, কেউ ক্লান্ত, কেউ আবার জানেই না কীভাবে কথা বলতে হয়—সব মিলিয়ে একটা দূরত্ব তৈরি হয়, যেটা কেউ ইচ্ছা করে না, কিন্তু হয়ে যায়।
অভিক সেটা বুঝত। কিন্তু বলত না। একদিন শুধু মাকে খুব আস্তে করে বলেছিল—“আমার কি আর আগের মতো থাকা হবে না?” মা কিছু বলেনি। শুধু ওষুধের পাতাটা টেবিলের এক পাশে রেখে দিয়েছিল, যেন উত্তরটা ওখানেই লুকিয়ে আছে।
এই নীরবতার ভেতর দিয়েই তার ভাঙন শুরু হয়। বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না। মানুষ ভাবে, সে শুধু চুপচাপ হয়ে গেছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা জায়গা ধীরে ধীরে সরতে থাকে, যেটা আগে তার নিজের ছিল।
সময়ের সাথে সাথে সে নিজের জায়গাটা হারাতে থাকে। যে মানুষ একসময় ব্যস্ততার কারণে দেখা করা কঠিন ছিল, সে-ই একসময় “পরে কথা হবে” বাক্যের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে মুছে যায়। ফোন আসে কম, দেখা হয় না বললেই চলে, আর সম্পর্কগুলো এমন এক অবস্থায় চলে যায় যেখানে কেউ আর জোর করে ধরে রাখে না।
চিকিৎসার ভাষায় একসময় একটা নাম আসে—সিজোফ্রেনিয়া। কিন্তু নামটা আসার আগেই অনেক কিছু বদলে গেছে, যেগুলোর কোনো নাম থাকে না। নাম আসলে শুধু একটা ফ্রেম তৈরি হয়, কিন্তু ভেতরের ভাঙনটা তার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়।
সে এখন কম কথা বলে। অনেক সময় জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু আসলে বাইরে কিছু দেখছে কি না বোঝা যায় না। চোখ থাকে ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন একটু দেরিতে কাজ করে। শব্দ আসে, কিন্তু অর্থটা ঠিকমতো পৌঁছায় না।
একবার প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করেছিল—
“ভাই, ঠিক আছো?”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ ছিল, তারপর বলেছিল—
“শব্দটা এখন বেশি জোরে লাগে।”
প্রতিবেশী আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
তার দিনগুলো এরপর আর আলাদা কিছু না। সকালে উঠে বসে থাকা, দুপুরে অল্প কিছু খাওয়া, বিকেলে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকা। কখনো মনে হয়, সে কোথাও অপেক্ষা করছে, কিন্তু কিসের জন্য—সেটা নিজেও পরিষ্কার না।
২০১৯ সালের দিকে একদিন রাতে তার স্ত্রী ক্লান্ত গলায় বলেছিল—“তুমি কি ওষুধটা খেয়েছো?”
অভিক একটু সময় নিয়ে বলেছিল— “আমি ভুলে যাই না… শুধু মনে থাকে না কখন খেতে হয়।”
এই বাক্যের পর ঘরটা আরও চুপ হয়ে যায়। কেউ আর বেশি কিছু বলে না, যেন বলার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই।
মানুষ তখন সহজ সিদ্ধান্ত নেয়—সে বদলে গেছে। কিন্তু কীভাবে বদলেছে, সেটা আর কেউ জানতে চায় না। কারণ জানার জন্য যে ধৈর্য দরকার, সেটা ধীরে ধীরে কারও থাকে না।
সে কখনো কখনো এমনভাবে থেমে যেত, যেন কারও বলা কথা অনেক দেরিতে তার মাথায় পৌঁছায়। আবার কখনো এমন কিছু দেখে ফেলত, যেটা অন্যরা দেখত না। তখন তার চোখে একটা অচেনা স্থিরতা চলে আসত, যেটা ব্যাখ্যা করা কঠিন।
২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যা।
সে বের হয়েছিল এমনভাবে, যেন বের হওয়াটা আলাদা কোনো সিদ্ধান্ত নয়—শুধু হাঁটার একটা ধারাবাহিকতা। শহরের রাস্তা তাকে অস্থির করছিল। গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড়—সবকিছু তার মাথার ভেতর বাড়তি চাপ তৈরি করছিল। তাই সে রেললাইনের দিকে চলে যায়।
স্লিপারের ওপর পা রেখে সে হাঁটতে থাকে, ধীরে, একটার পর একটা। যেন হাঁটা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
হঠাৎ তার ফোনটা বেজে ওঠে। সে থেমে যায়। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
কণ্ঠটা আসে ওপাশ থেকে—
“তুমি কোথায় আছো?”
সে উত্তর দেয় না সঙ্গে সঙ্গে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুধু বলে—
“আমি ঠিক আছি মনে হয়।”
লাইনটা শেষ হওয়ার পরও সে ফোনটা কানে ধরে রাখে। তারপর আস্তে করে পকেটে রেখে দেয়।
রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে সে একটু হাসে, খুব ছোট একটা হাসি—যেন নিজের কোনো পুরোনো কথা মনে পড়েছে, কিন্তু সেটা ঠিক আনন্দ না কি কষ্ট, বোঝা যায় না।
দূরে একটা আলো দেখা যায়। প্রথমে ছোট, পরে ধীরে ধীরে বড় হয়। তার মুখে হঠাৎ একটা পরিচিত ভঙ্গি আসে—যেন সে কিছু চিনে ফেলেছে। চোখ একটু স্থির হয়ে যায়।
সে খুব আস্তে বলে—“ওই তো… আমার গাড়ি আসছে।”
তারপর কয়েকটা সেকেন্ড। শব্দটা বদলে যায়। এই সময়ের ভেতর শব্দ আর তার ভেতরের নীরবতা আলাদা থাকে না। কোনটা বাস্তব, কোনটা নয়—সেই সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যায়।
সে আর এগোয় না। দাঁড়িয়ে থাকে, যেন অপেক্ষা করছে।
তারপর—
একটা দীর্ঘ শব্দ, আলো, আর হঠাৎ কেটে যাওয়া সময়।
পরের দৃশ্যটা কেউ ঠিকভাবে মনে রাখতে পারে না। শুধু একটা জায়গা থাকে, যেটা পরে মানুষ দূর থেকে দেখে, কিন্তু বেশি কাছে যায় না।
রেললাইনের ধারে একটা জিনিস পড়ে ছিল—যেটা আগে কোনো এক পায়ে ছিল। আর বাতাস সেখানে খুব সাধারণভাবে বইছিল, যেন কিছুই হয়নি।
বাকি সবকিছু শব্দের মতো ধীরে ধীরে মুছে যায়।
বিঃদ্রঃ এটি একটি গল্পভিত্তিক রচনা। চিকিৎসাবিষয়ক লক্ষণ দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।