ভালো বাবা হতে গিয়ে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৯ আগস্ট ২০২৬
মেঘলা ছোটবেলায় একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলেছিল,
বাবা, সবাইকে নতুন জুতো দিয়েছে। আমারটাও কি এবার বদলাবে?
অভিক জুতোটার দিকে তাকিয়েছিল। সামনের অংশটা ঘষে সাদা হয়ে গেছে, ফিতাটাও এক পাশে ছিঁড়ে ছিল।
সে হেসে বলেছিল,
অবশ্যই বদলাবে। এই মাসেই।
সেদিন রাতে অভিক হিসাবের খাতা খুলে বসেছিল।
বাড়িভাড়া। বাজার। বিদ্যুৎ বিল। মিশির স্কুলের বেতন। নিশির ওষুধ।
সব শেষে নতুন জুতোর দামটা লিখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর খাতাটা বন্ধ করে দিল।
পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে জুতো কিনে এনেছিল।
নিজের জন্য যে শার্টটা নেওয়ার কথা ছিল, সেটা আর নেওয়া হয়নি।
মেঘলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর খরচ বেড়ে গেল। ফি, বই, যাতায়াত—মাসের শেষে অভিকের হাতে খুব বেশি কিছু থাকত না।
একদিন অফিসে বসে সে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যালান্স দেখছিল।
নতুন চশমা দরকার ছিল তার। কয়েকদিন ধরে পুরোনো চশমায় চোখে চাপ পড়ছিল।
ঠিক তখন মেঘলা ফোন করল।
বাবা, আমার একটা টাকা লাগবে।
কত?
মেঘলা পরিমাণ বলল।
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
ঠিক আছে। পাঠিয়ে দিচ্ছি।
ফোন রেখে সে নিজের চশমাটার দিকে তাকাল।
তারপর ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মেয়ের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিল।
কয়েক দিন পর মেঘলা বাবার ঘরে একটা কাগজ খুঁজতে গিয়ে আলমারির ড্রয়ার খুলেছিল।
ভেতরে একটা পুরোনো প্রেসক্রিপশন।
চশমার দোকানের একটা বিলও ছিল।
তারিখটা কয়েক মাস আগের।
মেঘলা হিসাব মিলিয়ে দেখল—বাবা চশমাটা কেনেননি।
সন্ধ্যায় বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
বাবা, তুমি নতুন চশমা নাওনি কেন?
অভিক খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলে বলল,
পুরোনোটাই তো চলছে।
চলছে?
হুম।
আমার টাকাটা দেওয়ার জন্য তুমি চশমা নাওনি?
অভিক এবার খবরের কাগজটা নামিয়ে রাখল।
কে বলেছে?
তোমার ড্রয়ারে বিলটা দেখেছি।
অভিক একটু হেসে বলল,
তুই এসব নিয়ে মাথা ঘামাস না।
মেঘলা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বাবা, তুমি কি ভাবো, তোমার নিজের কিছু লাগলে সেটা না কিনে আমাকে দিলে আমি খুশি হব?
অভিক উত্তর দিল না।
মেঘলার গলা কেঁপে উঠল,
তুমি আমাদের সবকিছু দিতে চাও। কিন্তু তুমি যদি নিজের যত্নই না নাও, তাহলে আমরা কী পেলাম?
অভিক এবার মেয়ের দিকে তাকাল।
অনেকক্ষণ পর বলল,
তোদের কিছু কম দিতে চাই না।
কিন্তু বাবা, সবকিছু দেওয়া যায় না।
অভিক হেসে বলল,
জানি।
তাহলে এত চেষ্টা করো কেন?
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
তোরা যেন কোনোদিন মনে না করিস, তোদের বাবা চেষ্টা করেনি।
মেঘলার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
সে বাবার পাশে গিয়ে বসল।
আমরা কখনো সেটা ভাবিনি।
অভিক জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক দিন আগে মেঘলা একটা পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে পারেনি।
সেদিন রাতে দরজা বন্ধ করে বসেছিল।
অভিক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
মেঘ?
ভেতর থেকে কোনো উত্তর আসেনি।
একটু দরজা খোল তো।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলেছিল।
মেঘলার চোখ লাল।
আমি পারলাম না বাবা।
অভিক মেয়ের পাশে বসে বলেছিল,
একটা পরীক্ষায় কী আসে যায়?
মেঘলা নিচু গলায় বলেছিল,
তুমি কষ্ট পেয়েছ?
অভিক মাথা নেড়ে বলেছিল,
না।
সেদিন রাতে মেয়ের ঘর থেকে ফিরে অভিক অনেকক্ষণ বারান্দায় বসেছিল।
তার মনে হচ্ছিল, মেয়েটা যদি আরও ভালো করে পড়তে পারত, তাহলে হয়তো এমনটা হতো না।
রাতে নিশি খাবার গুছাচ্ছিল।
মেঘলা রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াল।
মা।
কী?
বাবা নিজের চশমা না কিনে আমার টাকা দিয়েছে।
নিশি হাত থামাল।
জানি।
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
জানো?
নিশি মৃদু হেসে বলল,
তোর বাবাকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি।
তারপর একটু থেমে বলল,
ও তোদের কষ্ট দেখতে পারে না। কিন্তু নিজের কষ্টের খবরও কাউকে দিতে চায় না।
মেঘলা কিছু বলল না।
সেদিন রাতে অভিক ঘুমাতে যাওয়ার আগে বিছানার পাশে রাখা পুরোনো চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল।
মেঘলা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
বাবা।
হুম?
কাল আমরা দুজন বের হব।
কোথায়?
চশমা বানাতে।
অভিক হেসে বলল,
এখন আবার এসব
মেঘলা মাঝখানেই থামিয়ে দিল।
না। এবার তোমার কথা শুনব না।
অভিক কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর হেসে ফেলল।
ঠিক আছে। যাব।
মেঘলা চলে যাওয়ার পর অভিক চশমাটা হাতে তুলে নিল।
কাঁচের এক পাশে ছোট্ট একটা দাগ।
সে আঙুল দিয়ে দাগটা মুছতে চেষ্টা করল।
দাগটা গেল না।
অভিক চশমাটা আবার টেবিলে রেখে বাতি নিভিয়ে দিল।
ঘরের বাইরে তখন নিশি মেঘলাকে বলছিল,
তোর বাবাকে বেশি বকিস না।
মেঘলা হেসে বলল,
বকব না। তবে এবার একটু নিজের কথাও শুনতে হবে তাকে।
ভেতরে শুয়ে অভিক কথাটা শুনল।
কিছু বলল না।
শুধু অন্ধকারে একবার মৃদু হাসল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।