বৃষ্টির ঠিকানা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৬ জুন, ২০২৬
সন্ধ্যার পর থেকেই বৃষ্টি।
টানা এমন বৃষ্টি, যেখানে রাস্তা আর ড্রেন আলাদা করে বোঝা যায় না।
অভিক হেলমেটের কাচটা হাতের তালু দিয়ে মুছে আবার বাইক চালাতে শুরু করল। ফোনে নতুন অর্ডার এসেছে।
সময়—বাইশ মিনিট।
অর্ডার বাতিল করলে ইনসেনটিভ কাটা যাবে।
দেরি হলে রেটিং কমবে।
যেতেই হবে।
প্যান্ট ভিজে হাঁটু পর্যন্ত ঠান্ডা পানি লেগে আছে। জুতোর ভেতর চুপচুপ শব্দ হচ্ছে।
মাসের শেষ।
মায়ের ওষুধ কিনতে হবে।
ছোট বোনের কলেজের বেতনও এখনও বাকি।
বৃষ্টি হলে শহরের মানুষ ঘরে বসে খাবার অর্ডার করে।
আর অভিকদের মতো মানুষ রাস্তায় নামে।
প্রথম অর্ডারটা ছিল একটা বড় অ্যাপার্টমেন্টে।
গেটে পৌঁছাতে তিন মিনিট দেরি হয়ে গেল।
সাততলায় উঠে কলিংবেল চাপতেই দরজা খুললেন একজন ভদ্রলোক।
খাবারের প্যাকেটটা হাতে নিয়েই বললেন,
এত দেরি হলো কেন?
অভিক বলল,
স্যার, রাস্তা...
লোকটা কথা শেষ করতে দিলেন না।
অজুহাত শুনতে চাই না।
দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
অভিক কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে লিফটের দিকে হাঁটল।
এসব নতুন না।
তবু প্রতিবারই একটু লাগে।
পরের অর্ডারটা খুব দূরে ছিল না।
একটা পুরোনো চারতলা বাড়ি।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দরজা খুললেন এক বৃদ্ধা।
খাবারের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে তিনি প্রথমেই বললেন,
আরে বাবা, একেবারে ভিজে গেছ!
অভিক শুধু হেসে মাথা নাড়ল।
দাঁড়াও।
বৃদ্ধা ভেতরে গিয়ে একটা শুকনো তোয়ালে এনে দিলেন।
তারপর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা।
অভিক অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
না খালা, লাগবে না। আর ডেলিভারি আছে।
চা খেতে দুই মিনিট লাগে। পৃথিবী থেমে থাকবে না।
কথাটা এমনভাবে বললেন, অভিক আর না করতে পারল না।
কাপটা হাতে নিতেই আঙুলে উষ্ণতা লাগল।
কতক্ষণ পরে যে শরীরটা একটু গরম হলো, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
বাড়ি কোথায় বাবা?
কেরানীগঞ্জ।
এত দূর থেকে আসো?
কী করব, কাজ তো।
বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
খাবারের দাম মিটিয়ে কয়েকটা টাকা বাড়িয়ে দিলেন।
অভিক সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
না খালা, এটা নিতে পারব না।
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
এটা বকশিশ না।
একজন মায়ের দোয়া মনে করে রাখো।
আজ আমার ছেলে যদি কোথাও বৃষ্টির মধ্যে কাজ করত, আমি চাইতাম কেউ ওর সঙ্গেও এমন আচরণ করুক।
অভিক কিছু বলল না।
কথা খুঁজে পেল না।
বাইরে তখনও বৃষ্টি।
বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে একবার পেছনে তাকাল।
বৃদ্ধা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
হাত তুলে বললেন,
সাবধানে যেও বাবা।
অভিক মাথা নাড়ল।
রাত হয়ে গেছে।
শেষ ডেলিভারিটা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল সে।
একটা সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলতেই বাইক থামাল।
পাশেই আরেকজন ডেলিভারি রাইডার দাঁড়িয়ে।
ছেলেটার গায়েও ভেজা জামা।
ঠোঁট কাঁপছে ঠান্ডায়।
অভিক হঠাৎ মনে পড়ল, বৃদ্ধা চায়ের সঙ্গে একটা ছোট বিস্কুটের প্যাকেটও দিয়েছিলেন।
ব্যাগের ভেতর এখনও আছে।
সে প্যাকেটটা বের করে ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দিল।
নাও ভাই।
ছেলেটা অবাক হয়ে তাকাল।
কেন?
অভিক হেসে বলল,
আজ আমাকেও একজন খাইয়েছে।
সবুজ বাতি জ্বলে উঠল।
দুজনেই আবার বাইক চালিয়ে চলে গেল।
রাত আরও গভীর হলো।
বৃষ্টি তখনও থামেনি।
বাড়ি ফিরে মা দরজা খুলে বললেন,
খুব ভিজেছিস?
অভিক জুতো খুলে দরজার পাশে রেখে হাসল।
হ্যাঁ।
মা তোয়ালেটা এগিয়ে দিতে দিতে বললেন,
আজ খুব কষ্ট হয়েছে?
অভিক একটু ভেবে বলল,
কষ্ট তো হয়েছেই।
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
কিন্তু আজ বৃষ্টির মধ্যে একজন মানুষ আমার দিনটা বদলে দিয়েছে।
জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
অভিক চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, শহরটা শুধু বড় বড় বাড়ি দিয়ে তৈরি না।
কিছু খোলা দরজা দিয়েও তৈরি। আর সেই দরজাগুলোর ভেতরেই মানুষ এখনও মানুষ হয়ে বেঁচে আছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।