স্বপ্নের আলো
লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরন: ছোটগল্প
(বাস্তব কাহিনীর আলোকে)
তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫
সকালের হালকা কুয়াশা ভেসে আসে ছোট্ট ঘরের জানালার ফাঁকে। কিন্তু অভিকের চোখে আজও কোনো আলো নেই। ঘরের এক কোণে বসে আছে লামিয়া, চোখে লাজুক আলো, মুখে আশা—এই বছর সে এইচ.এস.সি পরীক্ষা পাশ করেছে। প্রশংসা এসেছে, স্বপ্ন দেখছে—কিন্তু বাস্তবতার ভার তার কাঁধে চাপা।
অভিক জানে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন—ফি, গাইড বই, কোচিং, যাতায়াত—সবই তার সাধ্যের বাইরে। প্রতিদিন সকালে উঠে সে প্রশ্ন করে নিজেকে—“আমার মেয়ে, আমি কি তোমার স্বপ্নকে অসম্পূর্ণ রেখেছি?”
কোনো উত্তর নেই, শুধু নিঃশব্দ দুশ্চিন্তা।
দিন যত বাড়ে, অভিকের হৃদয়ে ব্যথা তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন আকাশের থেকে পড়া ভারী বৃষ্টি—শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, এবং হৃদয়ের দমবন্ধ করা ব্যথা।
ICU-এর চারপাশে সাদা বেড, জটিল যন্ত্রের আওয়াজ, অক্সিজেনের নল—সব মিলিয়ে এক অচেনা আতঙ্ক। আর এই শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে তার মেয়ের স্বপ্নের দায় তার কাঁধের ওপর চাপের মতো ভারী হয়ে পড়েছে।
লামিয়ার চোখে আজও জ্বলে আশা।
“বাবা, হয়তো সব স্বপ্ন পূর্ণ হবে না, কিন্তু আমি হাল ছাড়ব না। তুমি পাশে থাকো—এইটাই যথেষ্ট।”
অভিকের চোখ ভিজে যায়। সে বুঝে নেয়—স্বপ্নের পথে শুধু অর্থ নয়, ভালোবাসা আর সাহসও অপরিহার্য।
লামিয়া জানালার পাশে বসে থাকে, হাতে কোনো গাইড বই নেই। মনে মনে বলে,
“আমি পড়তে চাই, কিন্তু বইয়ের পাতা উল্টানোও যেন অসম্ভব কারন বই তো নেই।”
প্রতিটি দিন যেন যুদ্ধ, আর প্রতিটি রাত যেন দমবন্ধ করা অবসাদে ভরা।
ICU-এর ব্যয়, মেয়ের ভর্তি খরচ, প্রতিদিনের খাবার—সবই মিলিয়ে এক অসম্ভব বোঝা।
অভিকের হাতে হাত ধরে মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, “বাবা, তুমি বাঁচো, আমি আমার স্বপ্ন বাঁচাব। আমরা একসাথে সব পারব।”
সেই ছোট্ট কণ্ঠের শক্তি অভিকের দেহে নতুন শক্তি ঢুকিয়ে দেয়। ICU-এর যন্ত্রের আওয়াজ, ওষুধের গন্ধ, এবং ব্যথার মধ্যে তিনি দেখেন জীবনের সবচেয়ে প্রজ্ঞাময় শিক্ষা—ভালোবাসা, ধৈর্য, ও আশার শক্তি।
একদিন, অভিকের নামের পাশে অচেনা ইমেইল আসে। একজন সৎ ব্যক্তি, যিনি লামিয়ার শিক্ষাজীবনের কথা শুনেছেন, নিজের খরচে ভর্তি ফি এবং কোচিং খরচ বহন করতে ইচ্ছুক।
অভিক চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। যে স্বপ্ন অসম্পূর্ণ মনে হচ্ছিল, হঠাৎ পূর্ণতার দিকে এগোতে শুরু করে।
লামিয়া বুঝে যায়—মেয়ের স্বপ্ন কখনো একা নয়। মানুষের ভালোবাসা, সহানুভূতি, এবং পরিবারের দৃঢ় প্রেরণা মিলেই অন্ধকারকে আলোর দিকে ফেরায়।
ICU-এর সাদা কঙ্কাল-কাঠামো আর যন্ত্রের আওয়াজ মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ব্যথা, কষ্ট, আর ভয়—সব মিলিয়ে মানবতার চিরন্তন শক্তি ফুটে ওঠে।
অবশেষে ICU-এর দিনগুলি কাটল। অভিক বেঁচে থাকল, আর মেয়ের স্বপ্ন জীবনে আলো আনল।
বাবা হাত ধরে লামিয়া বলল,
“বাবা, তুমি বাঁচলে, আমার স্বপ্নও বাঁচবে।”
প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে তারা শিখছে—ভালোবাসা, সংগ্রাম, ধৈর্য, এবং আশার অশেষ শক্তি।
কিন্তু সত্যিই কি লামিয়ার জীবনে এমন কোন ভালো মানুষ সাহায্যের হাত বাড়াবে?
অভিক কি সত্যিই আবার তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে, নাকি তার পরিণতি হবে শেষ বিদায়ে?
এমন নানা প্রশ্নের জবাব পাঠকরা নিজেই খুঁজুন।
কারণ এটা সত্য—লেখাটিতে যেমন অভিক বাঁচা-মরার সন্ধিক্ষণে, তেমনি লামিয়ার স্বপ্নও তার জীবনে অগ্রগতি আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের মাঝেই নাচছে।
#স্বপ্নেরআলো #ছোটগল্প #পারিবারিকআবেগ #হৃদয়স্পর্শী #শিক্ষারসপ্ন #ICUসংগ্রাম #ভালোবাসা_এবং_আশা #জাহিদলেখা #enolej_idea
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।