অবশিষ্ট
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত এগারোটার পর অভিকের বাড়িটা একদম চুপ হয়ে যায়।
দিনের বেলায় অবশ্য নানা শব্দ থাকে। গেট খোলার শব্দ, পাশের বাড়ির টিভি, রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা, রান্নাঘরে বাসনের টুংটাং। রাত বাড়লে একে একে সব থেমে যায়। শেষে শুধু দেয়াল ঘড়ির কাঁটাটা টিকটিক করে।
একসময় এই বাড়িতে চারজন মানুষ থাকত। অভিক, নিশি, মেঘ আর মিশি। নিশি মারা গেছে চার বছর হলো। মেঘের বিয়ে হয়েছে, নিজের সংসারে থাকে। মিশি চাকরি করে অন্য শহরে। তিনজনই এখন অন্য জায়গায়।
অভিক একা রয়ে গেছে পুরোনো ঘরটায়।
রাতে খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে সে। তারপর ওষুধ খায়। রান্নাঘরের বাতি নিভিয়ে ঘরে এসে বিছানার পাশের ছোট টেবিলের ড্রয়ারটা খোলে। ভেতর থেকে বের করে আনে একটা কালো খাতা। খাতাটা সবসময় ওই ড্রয়ারেই থাকে।
প্রথম পাতায় বড় করে লেখা, আমি মারা গেলে।
তার নিচে ছোট ছোট করে লেখা, ব্যাংকের কাগজপত্র আলমারির ওপরের তাকে আছে। মেঘের নামে করা লাল ফাইলটা দ্বিতীয় তাকে। মিশির জন্য একটা চিঠি আছে, ডান পাশের ড্রয়ারে। চশমাটা যেন ফেলে না দেয়। বারান্দার গাছগুলোতে পানি দিতে হবে। নিশির শাড়িগুলো মেঘকে দিতে হবে। শেষ লাইনটার পাশে এসে কলমটা একটু থেমে ছিল।
মেঘ যে নিশির শাড়ি নেবে না, সেটা অভিক জানে। তবুও লিখে রেখেছে। কিছু কথা মানুষ জানে হবে না, তারপরও লিখে রাখে।
শুক্রবারে মেঘ ফোন করে। বাবা, কেমন আছো, ভালো আছি, ওষুধ খেয়েছো, হ্যাঁ খেয়েছি, ডাক্তার দেখিয়েছো, দেখিয়েছি। একা থাকতে কষ্ট হয় না, না রে, আমরা তো আছি বাবা। অভিক আর কিছু বলে না।
ফোনটা কেটে গেলে সে কিছুক্ষণ মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। তারপর খাতাটা খুলে লেখে, মেঘকে বলা হয়নি, ও ফোন করার আগেই আমি ওর ফোনের জন্য অপেক্ষা করি। লেখাটা কিছুক্ষণ পড়ে, তারপর কলম দিয়ে কেটে দেয়।
এক রাতে মিশি ফোন করে। অনেকক্ষণ এটা-ওটা কথা বলার পর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, বাবা, তুমি কি আমাদের ওপর রাগ করে আছো। অভিক জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, কেন রাগ করব। জানি না, মনে হলো। না রে, তুই বেশি ভাবিস। মিশি বলে, আগামী মাসে আসব। আয়। দুদিন থাকব। দুদিন কেন, যতদিন ইচ্ছে থাক। তারপর মিশি আস্তে করে বলে, বাবা, তুমি থাকবে তো।
প্রশ্নটা শুনে অভিকের হাত থেমে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর বলে, থাকব।
সেদিন খাতায় আর কিছু লেখে না। শুধু তারিখটা লিখে রাখে।
কয়েকদিন পর মেঘ একটা সোয়েটার পাঠায়। সাথে একটা ছোট কাগজ, শীত আসছে, নিজের যত্ন নিও। সোয়েটারটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকে অভিক। নতুন কাপড়ের একটা গন্ধ আছে।
হঠাৎ মনে পড়ে, মেঘ ছোটবেলায় শীতের সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় সোয়েটার পরতে চাইত না। নিশি বলত, তুমি ওকে পরিয়ে দাও তো। অভিক জোর করে মেঘের গায়ে সোয়েটার পরিয়ে দিত, মেঘ মুখ বাঁকিয়ে থাকত। সেই মুখটা মনে পড়তেই অভিকের ঠোঁটে একটু হাসি আসে। হাসিটা বেশিক্ষণ থাকে না। সে আস্তে করে বলে, মনে পড়ল? ঘরে কেউ নেই, কোনো উত্তর আসে না।
কয়েকদিন পর আবার খাতা খোলে। লেখে, আমার মৃত্যুর পর কেউ যেন নিজেকে দোষী মনে না করে। একটু পর লাইনটা কেটে দেয়। তার নিচে লেখে, আমি কারও ওপর রাগ করে যাচ্ছি না। এটাও কেটে দেয়। অনেকক্ষণ খাতাটা খোলা পড়ে থাকে। শেষে লেখে, তোমরা ব্যস্ত ছিলে, আমি বুঝতাম। এই লাইনটার ওপর আর দাগ দেয় না।
দিনগুলো এভাবেই চলতে থাকে। মেঘ কয়েকদিন ফোন করে না, মিশিও না। অভিকও কাউকে ফোন করে না। সকালে উঠে চা বানায়, বারান্দায় বসে রাস্তা দেখে, দুপুরে একা খায়, বিকেলে ওষুধ খায়। রাতে খাবার গুছিয়ে রেখে কালো খাতাটা খুলে বসে।
কখনো লেখে, ফ্রিজটা মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যায়। বাথরুমের কলটা ঠিক করতে হবে। মানিপ্ল্যান্টের টবটা বদলাতে হবে।
একদিন লেখে, আমার কিছু নেই। তারপর অনেকক্ষণ কলম হাতে বসে থাকে। শেষে নিচে ছোট করে লেখে, আসলে আছে।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিশির ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ছবিতে নিশি হাসছে। অভিক বলেছিল, কাল কথা হবে। কী কথা বলবে, সে নিজেও জানে না।
পরদিন সকালে পাশের বাড়ির লোকজন দরজা খুলে দেখে অভিক বিছানায় শুয়ে আছে। ঘুমের মধ্যেই চলে গেছে।
মেঘ দুপুরের পর আসে। ঘরে ঢুকে প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক মনে হয় না। টেবিলের ওপর বাবার চশমা, চেয়ারের পেছনে নতুন সোয়েটারটা, রান্নাঘরে ধোয়া একটা কাপ, গুছিয়ে রাখা ওষুধের পাতা, দেয়ালে নিশির ছবি। মেঘ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় বাবা হয়তো পাশের ঘরেই আছে, একটু পর বেরিয়ে এসে বলবে, মেঘ এসেছিস।
কেউ কিছু বলে না।
আলমারি খুলতে গিয়ে মেঘ কালো খাতাটা পায়। প্রথমে সাধারণ কথাগুলো পড়ে, ব্যাংকের কাগজ, লাল ফাইল, চিঠি, গাছের পানি, নিশির শাড়ি। তারপর সেই লাইনটা, তোমরা ব্যস্ত ছিলে, আমি বুঝতাম।
মেঘের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শেষ পাতাটা খোলে। সেখানে মাত্র একটা লাইন লেখা, শুধু মাঝে মাঝে মনে রেখো, আমি কিন্তু শেষ দিন পর্যন্ত তোমাদের জন্য অপেক্ষা করেছিলাম।
মেঘ আর পড়তে পারে না। চোখের পানি খাতার পাতায় পড়ে।
বিকেলের আলো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। মেঘ বাবার চশমাটা হাতে নেয়। কাচের ভেতর দিয়ে ঘরটা ঝাপসা দেখায়। চশমাটা আবার টেবিলে রেখে দেয়, তারপর বাবার হাতের লেখার ওপর আঙুল ছুঁয়ে বসে থাকে।
ঘরটা আগের মতোই আছে। চেয়ার আছে, টেবিল আছে, চশমা আছে, সোয়েটার আছে, নিশির ছবি আছে। শুধু অভিক নেই।
টেবিলে খাতাটা খোলা পড়ে আছে, পাশে কলমটা। আর ঘরে পড়ে আছে একটা মানুষের রেখে যাওয়া অবশিষ্ট।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।